কবরখানার নীল আলোর নারী
লোকেশন: রোমানিয়া, ট্রান্সিলভানিয়ার এক পরিত্যক্ত গ্রাম – ব্রাসোভের উপকণ্ঠ
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। শীতের কুয়াশা জমে চারদিক এমনভাবে ঢেকে রেখেছিল, যেন পৃথিবীটা আর বেঁচে নেই—শুধু স্মৃতিগুলো ভেসে আছে বাতাসে। আমি তখন রোমানিয়ায় গবেষণার কাজে গিয়েছি, ইউরোপের পুরনো লোককথা নিয়ে কাজ করছিলাম। ট্রান্সিলভানিয়া অঞ্চলের একটা ছোট গ্রামে ছিলাম, যেখানে আজও মানুষ অদ্ভুত সব কাহিনী বিশ্বাস করে। গ্রামটার নাম কেউ স্পষ্ট করে বলতে চায় না। শুধু বলে—“ওখানে গেলে নাম জিজ্ঞেস করো না, ফিরে আসতে পারবে না।” সেই রাতেই প্রথম শুনেছিলাম “নীল আলোর নারী”-র কথা। গ্রামের বৃদ্ধ এক লোক, নাম আন্দ্রেই, আমাকে বলেছিল—“তুমি যদি সত্যি জানতে চাও, তবে কবরখানায় যাও। কিন্তু মনে রেখো, যদি তাকে দেখো... ডাক শুনলেও পেছনে ফিরবে না।” আমি হেসেছিলাম। বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, ভূত-প্রেত এসব বিশ্বাস করি না। কিন্তু মানুষের ভয় আর গল্প—সেগুলোই তো আমার গবেষণার বিষয়। তাই সেদিন রাতেই বেরিয়ে পড়লাম। কবরখানাটা ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তে, একটা শুকনো পাহাড়ের পাশে। গেটটা ভাঙা, লোহার শিকগুলো মরিচা পড়ে কালো হয়ে গেছে। ভিতরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ—পুরনো মাটি, ভেজা কাঠ আর যেন কিছু একটা পচে যাওয়ার মতো।
কুয়াশার মধ্যে কবরগুলো আধা দেখা যাচ্ছে, আধা অদৃশ্য। গাছগুলো সব শুকনো, ডালপালা এমনভাবে বাঁকা যেন কেউ কষ্টে হাত বাড়িয়ে আছে। আমি ফোনের আলো জ্বালালাম, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার—আলোটা ঠিকমতো কাজ করছিল না। যেন কুয়াশা আলোটাকে গিলে ফেলছে। হঠাৎ দূরে একটা মৃদু নীল আলো দেখতে পেলাম। প্রথমে ভাবলাম হয়তো কোনো গাড়ি বা লাইট। কিন্তু না, আলোটা স্থির নয়—ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমার বুকের ভিতর হালকা চাপ অনুভব করলাম, কিন্তু কৌতূহল আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেল। যত কাছে গেলাম, তত স্পষ্ট হতে লাগল দৃশ্যটা।
একজন নারী, সে মাটির ওপর হাঁটছে না—ভাসছে। তার পুরো শরীর থেকে একটা নীল আভা বের হচ্ছে। চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, কিন্তু আশেপাশে কোনো বাতাস নেই। তার পোশাক যেন পুরনো যুগের—সাদা, লম্বা, ছেঁড়া কাপড়ের মতো। তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু চোখদুটো—অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল। আমি স্থির হয়ে গেলাম। হঠাৎ সে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল। আমার মনে হলো, সে আমাকে অনেক আগে থেকেই দেখছে। তারপর… সে হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না—শুধু শূন্যতা।হঠাৎ সে হাত বাড়িয়ে দিল, যেন আমাকে ডাকছে। আমি মনে করতে পারলাম আন্দ্রেইর কথা—“ডাক শুনলেও পেছনে ফিরবে না।” কিন্তু আমার শরীর যেন আমার কথা শুনছিল না। আমি এক পা এগোলাম, তারপর আরেক পা। তারপর… হঠাৎ আমার কানে ভেসে এল একটা ফিসফিস শব্দ।
“তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছো…?” আমি চারদিকে তাকালাম। কেউ নেই। কিন্তু শব্দটা যেন আমার মাথার ভিতর থেকেই আসছে।নারীটা এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। প্রতিটি মুহূর্তে সে কাছে আসছে, আর আশেপাশের কবরগুলো যেন আরও অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। আমি এবার পিছু হটতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পা নড়ছে না। মনে হচ্ছিল, মাটির নিচে কেউ আমার পা ধরে রেখেছে।নারীটা এখন একদম সামনে। তার মুখটা এবার পরিষ্কার দেখা গেল। কিন্তু সেটা মানুষের মুখ না। তার চোখদুটো ফাঁকা, ভেতরে শুধু নীল আলো ঘুরছে। ঠোঁটগুলো ফেটে গেছে, যেন অনেকদিন আগে মারা গেছে। সে খুব ধীরে আমার দিকে ঝুঁকে বলল— “তুমি দেরি করে ফেলেছো…” হঠাৎ চারপাশে অদ্ভুত শব্দ শুরু হলো। মাটির নিচ থেকে যেন কেউ নড়ছে। কবরগুলোর ভেতর থেকে চাপা আওয়াজ আসছে। আমি মরিয়া হয়ে চোখ বন্ধ করলাম।
মনে মনে শুধু একটা কথাই বলছিলাম—“এটা বাস্তব না, এটা বাস্তব না…” হঠাৎ সব চুপ, আমি ধীরে ধীরে চোখ খুললাম, সব কিছু আগের মতো। কোনো আলো নেই, কোনো নারী নেই। শুধু কুয়াশা আর কবর, আমি দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। পরদিন সকালে আবার আন্দ্রেইর কাছে গেলাম। সে আমার মুখ দেখে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। শুধু বলল—“তুমি তাকে দেখেছো।” আমি চুপ করে মাথা নাড়লাম। সে একটা পুরনো গল্প বলতে শুরু করল। অনেক বছর আগে, এই গ্রামে এক অভিজাত পরিবারের মেয়ে ছিল। তার নাম ছিল এলেনা। তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয় এক নিষ্ঠুর মানুষের সাথে। বিয়ের পর সে নির্যাতনের শিকার হয়, আর এক রাতে সে পালিয়ে এই কবরখানায় আশ্রয় নেয়।
কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি। সেই রাতেই সে মারা যায়—কেউ বলে আত্মহত্যা, কেউ বলে তাকে হত্যা করা হয়। তারপর থেকেই নীল আলো দেখা যায়। যারা তাকে দেখে, তারা আর আগের মতো থাকে না।কেউ পাগল হয়ে যায়, কেউ হারিয়ে যায়। আর কেউ কেউ… কয়েকদিন পর নিজে থেকেই এই কবরখানায় ফিরে আসে। আমি হাসার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। কারণ আমি তখনই বুঝতে পারছিলাম— গত রাতের সেই ফিসফিস শব্দটা আবার শুনছি। “তুমি কি আবার আসবে…?” তারপর থেকে আমার জীবন আর আগের মতো নেই। রাতে ঘুমাতে পারি না। আয়নায় নিজের মুখ দেখলে মনে হয় কেউ আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। আর মাঝে মাঝে… আমার ঘরের অন্ধকারে একটা নীল আলো জ্বলে ওঠে।

0 Comments