লোকেশন: উত্তর ইউরোপের একটি অজানা বনাঞ্চল, নরওয়ের সীমান্তঘেঁষা প্রাচীন “স্কোভহেইম ফরেস্ট”

বনের ভিতর এমন এক নীরবতা থাকে, যা কখনও কখনও শব্দের থেকেও বেশি ভয়ংকর। স্কোভহেইম ফরেস্টের সেই নীরবতা যেন মানুষের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে—এখানে বাতাসও যেন অনুমতি নিয়ে বইতে আসে।

১৮৯৭ সালের শেষ দিকে, নরওয়ের একটি ছোট্ট গ্রাম—এল্ডারভিক। পাহাড়ের কোলে, বরফঢাকা নদীর পাশে গড়ে ওঠা এই গ্রামটি একসময় ছিল শান্ত, কিন্তু হঠাৎ করেই একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। গ্রামের মানুষ প্রথমে বিষয়টা গুরুত্ব দেয়নি। বনের দিকে যাওয়া কিছু গবাদি পশু আর ফিরে আসেনি। তারপর কয়েকজন কাঠুরে নিখোঁজ হয়ে যায়। কেউ কেউ দাবি করেছিল, তারা বনের ভিতর অদ্ভুত ছায়া দেখেছে—একটা বিশাল, শিংওয়ালা প্রাণী, যা মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু মানুষ নয়। কিন্তু আসল ঘটনা শুরু হয় এলিনা হালভারসনের আগমনের পর। এলিনা ছিল শহরের মেয়ে। সে এল্ডারভিকে এসেছিল তার মৃত দাদীর পুরোনো বাড়ি বিক্রি করতে। গ্রামের লোকেরা তাকে বারবার সাবধান করেছিল—“বনের দিকে যেও না, বিশেষ করে পূর্ণিমার রাতে।” কিন্তু শহরের মেয়েরা যেমন হয়—কৌতূহলী, যুক্তিবাদী—এলিনা এসব কথায় হাসতো। প্রথম রাতে সে কিছুই টের পায়নি। কিন্তু দ্বিতীয় রাতে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে কিছু একটা লক্ষ্য করলো। বনের গভীর থেকে যেন কেউ তাকিয়ে আছে। চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়—একটা ভারী উপস্থিতি। তৃতীয় রাতে, পূর্ণিমা উঠতেই অদ্ভুত কিছু ঘটলো। চাঁদের আলোয় বনটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠলো। গাছের ছায়াগুলো নড়ছে, যেন কেউ হাঁটছে তাদের মধ্যে দিয়ে। এলিনা নিজেকে আটকাতে পারলো না। একটা লণ্ঠন হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়লো বনের দিকে। যত গভীরে গেল, তত ঠান্ডা বাড়তে লাগলো। বাতাসে একটা পচা গন্ধ—যেন বহুদিনের মৃত কিছু এখনো মাটির নিচে শ্বাস নিচ্ছে। হঠাৎ সে থেমে গেল।

তার সামনে, এক ফাঁকা জায়গায়, দাঁড়িয়ে আছে “ওটা”। প্রথমে মনে হলো একটা বিশাল গাছ। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলো—ওটা গাছ নয়। ওটা একটা প্রাণী। তার শরীরটা যেন মরা কাঠ আর কালো লোমে ঢাকা। মাথার ওপর থেকে বেরিয়ে এসেছে দুটো বিশাল বাঁকানো শিং—যেন অন্ধকার আকাশ ছিঁড়ে ফেলতে পারে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর—তার চোখ নেই। তবুও সে দেখছে। এলিনা বুঝতে পারছিল—ওটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার গলা শুকিয়ে গেল। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। প্রাণীটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে মাটি কেঁপে উঠছে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—কোনো শব্দ নেই। একদম নীরব। হঠাৎ প্রাণীটা থেমে গেল। তারপর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। এলিনার মাথার ভিতর একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল— “তুমি ফিরে এসেছো…” এলিনা ভয়ে কাঁপতে লাগলো। “আমি… আমি কে?” কণ্ঠস্বরটা আবার বললো— “তুমি সেই রক্ত… যে আমাকে মুক্ত করবে…” এরপর তার সামনে যেন অন্য একটা দৃশ্য ফুটে উঠলো। একই বন, কিন্তু অনেক পুরোনো। আগুন জ্বলছে, মানুষ চিৎকার করছে। একটা মেয়ে—এলিনার মতোই দেখতে—তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। গ্রামের লোকেরা তাকে ডাইনি বলছে। আর সেই একই প্রাণী—দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা চিৎকার করে বলছে—

“আমি তোমাকে বেঁধে রাখবো! যতদিন আমার রক্ত বেঁচে থাকবে, তারপর আগুন। সবকিছু পুড়ে যাচ্ছে। দৃশ্যটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল, এলিনা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। তার মাথা ঘুরছে। সে বুঝতে পারলো—এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। সে এই গল্পের অংশ। হঠাৎ প্রাণীটা আবার কথা বললো— “শত বছর… আমি অপেক্ষা করেছি…” এলিনা উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে এখন ভয় নেই—বরং একটা অদ্ভুত শান্তি। “তুমি কি আমাকে মুক্তি দিতে চাও?” প্রাণীটা জিজ্ঞেস করলো। এলিনা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো— “না… আমি তোমাকে শেষ করতে এসেছি।” বনের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো। প্রাণীটা গর্জে উঠলো—প্রথমবারের মতো শব্দ শোনা গেল। একটা বিকট, অমানবিক আওয়াজ। এলিনা তার হাত সামনে বাড়ালো। তার হাতের তালুতে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠলো—কিন্তু সেটা সাধারণ আগুন নয়, বরং নীল রঙের, অদ্ভুত আলো।

“এই আগুন… তোমারই ভয়,” সে বললো। প্রাণীটা পিছিয়ে গেল। তার শরীর থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে লাগলো। “তুমি আমাকে ধ্বংস করতে পারবে না!” সে চিৎকার করলো। এলিনা চোখ বন্ধ করলো। তার চারপাশে বাতাস ঘুরতে লাগলো। গাছগুলো কাঁপছে। মাটি ফেটে যাচ্ছে। আর সেই আগুন ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো। হঠাৎ সবকিছু থেমে গেল। নীরবতা। যখন এলিনা চোখ খুললো, তখন বনে আর কিছুই নেই। না সেই প্রাণী, না সেই ভয়। শুধু চাঁদের আলো। সে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামে ফিরে এলো। পরদিন সকালে, গ্রামবাসীরা অবাক হয়ে দেখলো এলিনা নিখোঁজ। কেউ জানে না সে কোথায় গেল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো— তারপর থেকে আর কেউ বনে সেই প্রাণীটাকে দেখেনি। তবে মাঝে মাঝে, পূর্ণিমার রাতে, কেউ কেউ দাবি করে— বনের ভিতর একটা মেয়ের ছায়া দেখা যায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে। আর তার চারপাশে, গাছগুলো যেন নত হয়ে থাকে। যেন তারা এখনো তাকে ভয় পায়।