পূর্ণিমার রাতে জঙ্গলের সেই দোলনায় বসে থাকে যে মেয়েটি… সে আসলে কে?

কেশন: ব্ল্যাকউড ফরেস্ট, Black Forest

রাতটা ছিল অদ্ভুত শান্ত। সেই ধরনের শান্তি, যেটা মানুষকে স্বস্তি দেয় না—বরং বুকের ভেতর এক অদৃশ্য অস্বস্তি জমিয়ে তোলে। জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্টের গভীরে যারা কখনও গিয়েছে তারা জানে, এই জঙ্গলের রাত অন্য সব রাতের মতো নয়। এখানে বাতাসও যেন খুব ধীরে শ্বাস নেয়, আর গাছগুলো দাঁড়িয়ে থাকে যেন শত শত বছরের পুরনো কোনো গোপন কথা পাহারা দিচ্ছে।২০২১ সালের শরৎকালের শেষ দিকে এক ভ্রমণকারী ফটোগ্রাফার, নাম ধরা যাক এলিয়াস, এই জঙ্গলে গিয়েছিলেন। তার কাজ ছিল পৃথিবীর অদ্ভুত ও রহস্যময় জায়গার ছবি তোলা। ব্ল্যাক ফরেস্টের কথা তিনি অনেকবার শুনেছেন—কেউ বলে এখানে প্রাচীন কিংবদন্তি আছে, কেউ বলে রাতের পর এখানে কিছু দেখা যায় যা দিনের আলোতে কখনো থাকে না। সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল। আকাশে চাঁদটা এত বড় আর উজ্জ্বল ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন আকাশ থেকে নেমে এসে জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এলিয়াস তার ক্যামেরা নিয়ে হাঁটছিলেন সরু এক জঙ্গলের পথে। হঠাৎ তিনি দূরে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলেন। দুইটা বিশাল পুরোনো গাছের মাঝে একটা দোলনা ঝুলছে। বনের মাঝখানে দোলনা থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু এই দোলনাটা ছিল অদ্ভুত। দড়িগুলো খুব পুরোনো, কাঠের আসনটাও যেন বহু বছরের ক্ষয়ে মসৃণ হয়ে গেছে। আর সেই দোলনায় বসে আছে একটা মেয়ে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল—মেয়েটা একা বসে দুলছে।ধীরে… খুব ধীরে… চাঁদের আলো ঠিক তার পেছনে পড়েছে, ফলে সে কেবল ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছিল। এলিয়াস ভেবেছিলেন হয়তো কোনো পর্যটক বা গ্রামের কেউ। কিন্তু যতই তিনি কাছে যেতে লাগলেন, ততই অদ্ভুত লাগতে লাগল। জঙ্গলে কোনো শব্দ নেই। না পাখির ডাক, না পাতার আওয়াজ। শুধু দোলনার হালকা কঁক কঁক শব্দ। মেয়েটা সামনে পিছনে দুলছে, আর তার চুলগুলো বাতাসে একটু একটু নড়ছে। এলিয়াস ক্যামেরা তুলে ছবি তুললেন। ক্লিক। ক্যামেরার শব্দ হতেই দোলনাটা থেমে গেল। একদম থেমে গেল, তারপর কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতা। তারপর আবার দোলনা নড়তে শুরু করল। কিন্তু এবার ধীরে নয়… একটু দ্রুত। এলিয়াস তখনও বুঝতে পারছেন না ঠিক কী হচ্ছে। তিনি ভাবলেন হয়তো মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে।তিনি দূর থেকে বললেন,

“হ্যালো… তুমি কি ঠিক আছো?”

কোনো উত্তর নেই, দোলনা চলতেই থাকল। এবার একটু বেশি জোরে। এলিয়াস লক্ষ্য করলেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার। দোলনা সামনে যাচ্ছে… আবার পিছনে আসছে… কিন্তু মেয়েটার পা মাটিতে ছোঁয়াচ্ছে না। সে নিজে দোল খাচ্ছে না। দোলনাটা যেন নিজেই দুলছে। এই সময় হঠাৎ ঠান্ডা একটা বাতাস বয়ে গেল। জঙ্গলের সব গাছের পাতা একসাথে কেঁপে উঠল। আর তখনই মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা ঘোরালো। কিন্তু পুরোটা না, শুধু একটু। এতটাই যে তার মুখ দেখা যায় না। শুধু মনে হয় সে পিছনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। এলিয়াসের শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। তিনি ক্যামেরার স্ক্রিনে একটু আগে তোলা ছবিটা দেখলেন। আর ঠিক তখনই তার বুকের ভেতরটা জমে গেল। কারণ ছবিটাতে দোলনা আছে। চাঁদ আছে। গাছ আছে। কিন্তু… দোলনায় কেউ নেই। তিনি আবার সামনে তাকালেন। দোলনায় মেয়েটা এখনো বসে আছে। চাঁদের আলোয় ছায়া হয়ে। এলিয়াসের হাত কাঁপতে শুরু করল। তিনি আবার ছবি তুললেন। ক্লিক, আবার স্ক্রিনে দেখলেন। আবারও… দোলনায় কেউ নেই। এই সময় হঠাৎ দোলনাটা থেমে গেল, একদম থেমে গেল। মেয়েটা আর দুলছে না, সে স্থির হয়ে বসে আছে। তারপর ধীরে ধীরে সে দোলনা থেকে নেমে দাঁড়াল। এলিয়াস তখন পরিষ্কার দেখতে পেলেন—মেয়েটার পা মাটিতে পড়ছে না। সে দাঁড়িয়ে আছে… কিন্তু মাটি ছুঁয়েও না। তারপর সে ধীরে ধীরে জঙ্গলের ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগল। কিন্তু হাঁটার শব্দ নেই। পাতা নড়ছে না, শুধু ছায়াটা এগিয়ে যাচ্ছে। এলিয়াস যেন কোনো অজানা টানে তার পিছনে হাঁটতে শুরু করলেন। জঙ্গলের ভেতর ঢুকতেই চাঁদের আলো একটু কমে গেল।চারপাশে কুয়াশা জমতে শুরু করল। মেয়েটা সামনে যাচ্ছে… আর এলিয়াস তাকে অনুসরণ করছেন। হঠাৎ মেয়েটা থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে পিছনে তাকালো। এবার পুরো মুখ দেখা গেল। আর সেই মুখ দেখে এলিয়াসের গলা শুকিয়ে গেল।কারণ সেই মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চোখ দুটো খুব ফাঁকা। যেন বহু বছর ধরে কোনো মানুষ তাকে দেখেনি। মেয়েটা ফিসফিস করে একটা কথা বলল। জার্মান ভাষায়।

“তুমি কি আমার সাথে খেলবে?”

এরপর হঠাৎ চারপাশে বাতাসের শব্দ শুরু হল।গাছগুলো কাঁপতে লাগল। কুয়াশা ঘন হয়ে গেল। এলিয়াস ভয়ে পিছিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু তিনি দেখলেন— তার পিছনে আর কোনো পথ নেই, শুধু গাছ। আর অন্ধকার। পরদিন সকালে কাছের এক গ্রামের লোকজন জঙ্গলের সেই জায়গায় এলিয়াসের ক্যামেরাটা খুঁজে পায়।ক্যামেরার মেমোরিতে ছিল মাত্র তিনটা ছবি। প্রথম ছবিতে খালি দোলনা। দ্বিতীয় ছবিতে খালি দোলনা। তৃতীয় ছবিতে… দোলনায় বসে আছে একটা মেয়ে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এলিয়াস। কিন্তু এলিয়াসের মুখ দেখা যাচ্ছে না। কারণ তার মুখ পুরোটা ছায়ায় ঢাকা। আজও ব্ল্যাক ফরেস্টের সেই জায়গায় মাঝে মাঝে রাতে একটা দোলনা দুলতে দেখা যায়। লোকেরা বলে, পূর্ণিমার রাতে যদি কেউ খুব মন দিয়ে তাকিয়ে থাকে— তাহলে সে দেখতে পাবে এক মেয়ে দোল খাচ্ছে। আর সে অপেক্ষা করছে। কারও জন্য। কেউ যদি কাছে যায়… সে শুধু একটা প্রশ্ন করে। “তুমি কি আমার সাথে খেলবে?” আর যারা সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়— তাদের আর কেউ কোনোদিন দেখতে পায় না। শুধু মাঝে মাঝে জঙ্গলের ভেতর নতুন একটা ছায়া দেখা যায়। দোলনার পাশে দাঁড়িয়ে। চাঁদের আলোয়।