Location :- Luna Rosa Valley, Transylvania, Romania
রাতের আকাশটা সেদিন অদ্ভুত লাল ছিল। যেন কেউ বিশাল এক রক্তিম গোলক তুলে দিয়েছে আকাশের মাঝখানে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো পৃথিবীটাই সেই লাল আলোয় ধুয়ে গেছে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো গাছগুলোও যেন কালো ছায়ার মতো নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে সেই অস্বাভাবিক চাঁদের দিকে।
ইউরোপের পূর্বদিকে, রোমানিয়ার ট্রানসিলভানিয়ার এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে এমন এক জায়গা আছে, যেটাকে স্থানীয়রা বলে “লুনা রোসা ভ্যালি”—বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় “রক্তচাঁদের উপত্যকা”। পর্যটকদের মানচিত্রে এই জায়গার নাম খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু আশেপাশের গ্রামগুলোতে যারা থাকে, তারা জানে এই জায়গার একটা অদ্ভুত ইতিহাস আছে। বিশেষ করে যখন পূর্ণিমার রাতে চাঁদটা অস্বাভাবিক লাল হয়ে ওঠে।
প্রায় একশো বছর আগে, ১৯২৩ সালের শীতের শেষদিকে, কাছের এক ছোট্ট গ্রামে বাস করত এলিনা নামে এক মেয়ে। বয়স মাত্র দশ বা এগারো। গ্রামের সবাই তাকে চিনত তার হাসির জন্য। সারাদিন মাঠে দৌড়ানো, গাছের ডালে দোল খাওয়া আর নদীর ধারে বসে গান গাওয়া ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ।
গ্রামের ঠিক পাশেই ছিল এক বিশাল পুরনো ওক গাছ। সেই গাছের মোটা ডালে গ্রামের কারিগররা অনেক বছর আগে একটা কাঠের দোলনা ঝুলিয়ে দিয়েছিল। গ্রামের বাচ্চাদের কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এলিনা ছাড়া কেউ খুব বেশি সময় সেখানে থাকতে চাইত না।
কারণটা ছিল অদ্ভুত।
গ্রামের বৃদ্ধরা বলত, গাছটার নিচে নাকি রাত নামলে বাতাস বদলে যায়। পাখিরা চুপ হয়ে যায়, কুকুররা হঠাৎ করে ডেকে ওঠে, আর মাঝে মাঝে মনে হয় যেন কেউ অদৃশ্যভাবে দোলনাটা ঠেলে দিচ্ছে।
এসব কথা শুনে অন্য বাচ্চারা ভয় পেত, কিন্তু এলিনা হাসত। সে বলত, “ভূত থাকলে থাকুক, তারা যদি খেলতে চায় তাহলে আমি দোল খাওয়াব।”
দিনের বেলা সবকিছু স্বাভাবিকই লাগত। কিন্তু একদিন এলিনা খেয়াল করল, পূর্ণিমার রাতে যখন চাঁদটা লাল হয়ে ওঠে, তখন দোলনায় বসলে মনে হয় যেন কেউ তার সঙ্গে দোল খাচ্ছে। কেউ একজন অদৃশ্যভাবে তাকে একটু একটু করে সামনে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রথমে সে ভেবেছিল হয়তো বাতাস।
কিন্তু এক রাতে, সে স্পষ্ট শুনতে পেল খুব ক্ষীণ একটা ফিসফিস শব্দ।
“আরও উঁচুতে দোল খাও…”
এলিনা চারদিকে তাকিয়েছিল। কেউ ছিল না। শুধু সেই বিশাল লাল চাঁদ আর কালো ছায়ায় ঢেকে থাকা গাছগুলো।
তারপরও সে ভয় পায়নি।
পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রামে একটা অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হয়। মাঝরাতে গ্রামের কয়েকজন মানুষ দূর থেকে দেখত, পাহাড়ের ওই গাছটার নিচে দোলনা দুলছে। আর তার সামনে বিশাল লাল চাঁদ।
দোলনায় যেন একটা ছোট্ট ছায়া বসে আছে।
কিন্তু সমস্যা হল, সেই সময়ে এলিনা বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকত।
প্রথমে সবাই ভাবল হয়তো চোখের ভুল। কিন্তু এক রাতে গ্রামের শিক্ষক আন্দ্রে নিজেই পাহাড়ের দিকে গিয়েছিলেন বিষয়টা দেখতে।
তিনি পরে বলেছিলেন, সেই রাতের কথা তিনি জীবনে ভুলতে পারেননি।
কারণ তিনি যখন গাছটার কাছে পৌঁছান, তখন দেখেন দোলনাটা ধীরে ধীরে দুলছে। আর তার উপর বসে আছে একটা ছোট্ট মেয়ের ছায়া।
কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছিল না।
শুধু চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল।
আন্দ্রে ভেবেছিলেন সেটা এলিনা। তিনি ডাকলেন, “এলিনা?”
দোলনাটা থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে মেয়েটা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
কিন্তু আন্দ্রে বলেছিলেন, সেই মুখটা এলিনার ছিল না।
তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে ফাঁকা লাগছিল। যেন ভেতরে কোনো আলো নেই।
পরদিন সকালে আন্দ্রে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি আর কখনো সেই ঘটনার বিস্তারিত বলেননি। শুধু একটা কথাই বলতেন।
“ওটা দোল খাচ্ছিল না… ওটা অপেক্ষা করছিল।”
এরপর কয়েক মাস কেটে যায়। সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায় বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু ১৯২৪ সালের এক শরতের রাতে আবার সেই লাল চাঁদ উঠল।
সেদিন সন্ধ্যায় এলিনা নিখোঁজ হয়ে যায়।
গ্রামের মানুষ পুরো বন খুঁজে দেখেছিল। নদীর ধারে, পাহাড়ের গুহায়, চারদিকে।
শেষে তারা গিয়ে পৌঁছায় সেই পুরনো ওক গাছটার কাছে।
গাছের নিচে দোলনাটা হালকা দুলছিল।
আর আশ্চর্যের বিষয়—দোলনার কাঠের সিটে ছোট্ট একটা খোদাই করা দাগ দেখা গেল।
সেখানে লেখা ছিল শুধু একটা নাম।
“ELINA”
কিন্তু কেউ জানত না এটা কে লিখেছে।
কারণ গ্রামের কেউই আগের দিন পর্যন্ত ওই দাগ দেখেনি।
তারপর থেকে সেই জায়গাটা ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। গাছটা দাঁড়িয়ে থাকে, দোলনাটাও অনেক বছর ঝুলে ছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষ সূর্য ডোবার পরে আর কখনো সেখানে যায় না।
সময়ের সাথে সাথে ঘটনাটা প্রায় কিংবদন্তি হয়ে যায়।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, আজও মাঝে মাঝে কিছু পর্যটক দাবি করে তারা ওই গাছের কাছে অদ্ভুত কিছু দেখেছে।
২০১6 সালে এক জার্মান ফটোগ্রাফার রাতে আকাশের ছবি তুলতে গিয়েছিলেন সেই এলাকায়। তিনি পরে তার ব্লগে লিখেছিলেন, তিনি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছিলেন।
একটা বিশাল লাল পূর্ণিমা।
একটা কালো গাছ।
আর গাছের ডাল থেকে ঝুলছে একটা দোলনা।
দোলনায় বসে আছে একটা ছোট্ট মেয়ের ছায়া।
তার চুল বাতাসে উড়ছে।
কিন্তু আশেপাশে কোনো বাতাস ছিল না।
ফটোগ্রাফার ভেবেছিলেন হয়তো কোনো বাচ্চা। তাই তিনি কাছে যাওয়ার জন্য কয়েক পা এগোলেন।
ঠিক তখনই আকাশের দিকে উড়ে গেল কয়েকটা বাদুড়।
আর দোলনাটা হঠাৎ করে থেমে গেল।
মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
ফটোগ্রাফার বলেছিলেন, তিনি সেই মুহূর্তে বুঝতে পারেন এটা কোনো সাধারণ দৃশ্য নয়।
কারণ সেই মুখে কোনো স্পষ্ট চোখ বা অভিব্যক্তি ছিল না।
শুধু অদ্ভুত এক ফাঁকা অন্ধকার।
তিনি তাড়াতাড়ি ক্যামেরা তুলে ছবি তুলতে গিয়েছিলেন।
কিন্তু ছবি তোলার আগেই দোলনাটা খালি হয়ে যায়।
যেন কেউ কখনো সেখানে ছিলই না।
আজও সেই ছবিটা তার ক্যামেরায় নেই।
শুধু একটা ছবি আছে যেখানে দেখা যায় বিশাল লাল চাঁদ, কালো গাছ, আর হালকা দুলতে থাকা খালি দোলনা।
স্থানীয়রা বলে, লাল চাঁদের রাতে যদি কেউ ওই গাছের নিচে দাঁড়ায়, মাঝে মাঝে দোলনাটা নিজে নিজে নড়ে ওঠে।
আর খুব মন দিয়ে শুনলে একটা ফিসফিস শব্দ শোনা যায়।
“আরও উঁচুতে দোল খাও…”
কেউ কেউ বলে সেটা এলিনার কণ্ঠ।
আবার কেউ বলে, এলিনা হয়তো একা নয়।
কারণ মাঝে মাঝে ছায়াটা একটু বড় দেখায়।
যেন দোলনায় একজন নয়, দুজন বসে আছে।
আর তখন বাতাসে বাদুড় উড়তে শুরু করে।
গাছের ডালগুলো কাঁপতে থাকে।
আর সেই বিশাল লাল চাঁদটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
যেন আকাশ নিজেই সেই দৃশ্যটা দেখছে।
আজও ট্রানসিলভানিয়ার ওই পাহাড়ি উপত্যকায় গেলে পুরনো লোকেরা একটা সতর্কবাণী দেয়।
“লাল চাঁদের রাতে ওই গাছের কাছে যেও না।”
কারণ দোলনাটা এখনো আছে।
আর যদি কখনো দেখো দোলনাটা নিজে নিজে দুলছে…
তাহলে খুব কাছে যেও না।
কারণ তখন হয়তো কেউ তোমার জন্য জায়গা করে দিচ্ছে।

0 Comments