লোকেশন: ব্ল্যাকফেন মার্শ, নর্থ ইয়র্কশায়ার, ইংল্যান্ড

নর্থ ইয়র্কশায়ারের এক বিস্মৃত জলাভূমি— ব্ল্যাকফেন মার্শ, নর্থ ইয়র্কশায়ার, ইংল্যান্ডের এক বিস্মৃত জলাভূমি—যেখানে সন্ধ্যার পর খুব কম মানুষই পা বাড়ায়। আশেপাশের গ্রামগুলোতে একটা কথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে— “জলটা নড়ে না, কিন্তু কিছু একটা তাকিয়ে থাকে…”

১৮৭২ সালের পুরনো রেকর্ডে প্রথম এই জায়গার উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময়। একদল শ্রমিক সেখানে জল নিষ্কাশনের কাজ করতে গিয়ে অদ্ভুত কিছু দেখেছিল। তারা বলেছিল, কাদামাটির নিচে যেন কিছু একটা নড়ছে—মানুষের মতো, কিন্তু মানুষ নয়। সেই রিপোর্ট পরে ‘ভুল’ বলে বাতিল করা হয়। কিন্তু ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি।

২০২১ সালের অক্টোবর। শীত নামার আগের এক ধোঁয়াটে বিকেল। লন্ডন থেকে আগত একজন ভ্রমণ ব্লগার—ড্যানিয়েল হিউজ। সে ইউটিউব ও ফেসবুকে অজানা, ভৌতিক, পরিত্যক্ত জায়গার ভিডিও বানিয়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেই সূত্রেই সে পৌঁছে যায় ব্ল্যাকফেন মার্শে। গ্রামের লোকেরা তাকে বারবার নিষেধ করেছিল। এক বৃদ্ধ বলেছিল— “দিনে গেলে যেতে পারো, কিন্তু সূর্য ডোবার আগে ফিরে আসো। জল কখনো রাতে একই থাকে না…”

ড্যানিয়েল এসব কথা হেসে উড়িয়ে দেয়। কারণ তার কাছে ভৌতিক গল্প মানেই ছিল কনটেন্ট। ভিউ। সাবস্ক্রাইবার। সেদিন বিকেল ৪টা নাগাদ সে লাইভ ভিডিও চালু করে জলাভূমির ভেতরে ঢুকে পড়ে। প্রথম দিকে সব স্বাভাবিক ছিল। কুয়াশা, শুকনো গাছ, কালচে পানি—একটা সিনেম্যাটিক পরিবেশ। সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছিল— “Guys, this place looks creepy but honestly, nothing unusual so far…” তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল। কিন্তু ১০ মিনিট পর থেকেই কিছু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে শুরু করে। জল একদম স্থির থাকা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঢেউ উঠছিল—যেন নিচে কিছু চলছে। সে ক্যামেরা নামিয়ে জলের দিকে তাকায়। “Did you guys see that?”—সে ফিসফিস করে বলে। হঠাৎ করে তার পায়ের কাছে জল একটু ফুলে ওঠে। যেন ভেতর থেকে কেউ শ্বাস নিচ্ছে। ড্যানিয়েল প্রথমবারের মতো একটু অস্বস্তি অনুভব করে। কিন্তু সে এগোতে থাকে। জল ধীরে ধীরে তার হাঁটু পর্যন্ত উঠে আসে। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। পাখির ডাক নেই, বাতাস নেই—শুধু দূরে কোথাও যেন ধাতব কিছু কাঁপছে। হঠাৎ করে তার ক্যামেরার ফ্রেমে কিছু একটা ধরা পড়ে। জলের নিচে—দুইটা লাল আলো। চোখ। ড্যানিয়েল প্রথমে ভাবে এটা হয়তো কোনো প্রাণী। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই চোখ দুটো ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। তার বুক কেঁপে ওঠে। “Okay… that’s not normal…” তার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট ভয়। জল ফেটে উঠে আসে এক অদ্ভুত অবয়ব— একটা ক্ষীণকায়, কাদায় ঢাকা, মানুষের মতো শরীর। কিন্তু তার চোখ… জ্বলজ্বল করছে লাল আগুনের মতো। চুলগুলো ভেজা, জট পাকানো। ত্বক কালচে। শরীর যেন বহু বছর ধরে পানির নিচে পচে আছে, তবু জীবিত। সে সোজা ড্যানিয়েলের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো শব্দ নেই। শুধু তাকিয়ে থাকা। ড্যানিয়েল পিছিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যায়—কারণ তার পা যেন আটকে গেছে কাদায়। সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না। লাইভ ভিডিওতে তখন হাজার হাজার মানুষ দেখছিল। কমেন্ট আসতে থাকে— “RUN!” “WHAT IS THAT???” “Fake???” কিন্তু ড্যানিয়েলের চোখ তখন শুধু সেই জ্বলন্ত চোখের দিকে। ধীরে ধীরে সেই অবয়ব সামনে এগিয়ে আসে। জলের ওপর দিয়ে নয়—জলের ভেতর দিয়ে, যেন সেটা তার নিজের জায়গা। তার ঠোঁট একটু নড়ে। কিন্তু কোনো শব্দ শোনা যায় না। ড্যানিয়েলের ক্যামেরা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করে। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে যায়। তারপর হঠাৎ—ভিডিও কেটে যায়। পরদিন সকাল। গ্রামের কয়েকজন মানুষ ব্ল্যাকফেন মার্শের ধারে ড্যানিয়েলের ক্যামেরা খুঁজে পায়। কিন্তু ড্যানিয়েলকে আর কোথাও পাওয়া যায় না। পুলিশ আসে। তদন্ত হয়। কোনো দেহ পাওয়া যায় না। কিন্তু ক্যামেরার ফুটেজ… সেটা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওর শেষ ৫ সেকেন্ডে এক অদ্ভুত জিনিস দেখা যায়— ড্যানিয়েলের মুখের খুব কাছে সেই সত্ত্বা দাঁড়িয়ে আছে… আর তার চোখের ভেতরে প্রতিফলিত হচ্ছে—আরো অনেকগুলো চোখ। যেন সে একা নয়। এরপর থেকে ব্ল্যাকফেন মার্শ আবার খবরের শিরোনামে আসে। কিন্তু স্থানীয়রা মুখ খোলে না। শুধু একজন বৃদ্ধা বলেছিল— “ওটা কোনো ভূত না… ওরা ‘Watcher of the Mire’। শত শত বছর আগে এখানে যারা হারিয়ে গিয়েছিল… তারা আর ফিরে যায়নি। তারা নিচে থেকে যায়… অপেক্ষা করে…” “কার জন্য?”—একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিল। বৃদ্ধা একটু থেমে বলেছিল— “যারা তাকায়… তাদের জন্য।” আজও মাঝে মাঝে রাতে ওই জলাভূমির দিক থেকে লাল আলো দেখা যায় বলে শোনা যায়। কেউ কেউ বলে— ওটা শুধু চোখ নয়। ওটা একটা ডাক। যারা সেই ডাক শুনে এগিয়ে যায়… তারা আর ফিরে আসে না।