লোকেশন: ব্ল্যাকউড ভ্যালি, নর্থ ইয়র্কশায়ার, ইংল্যান্ড
রাত তখন প্রায় আড়াইটে। বাইরে কুয়াশা এমনভাবে জমে ছিল যেন পুরো গ্রামটা কোনো অদৃশ্য হাত এসে ঢেকে দিয়েছে। ব্ল্যাকউড ভ্যালি, নর্থ ইয়র্কশায়ার, ইংল্যান্ডের এক ছোট, প্রায় বিস্মৃত গ্রাম—যেখানে সন্ধ্যার পর খুব কম মানুষই বাইরে বের হয়। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, এখানে কিছু পুরনো ইতিহাস আছে, এমন ইতিহাস যা কেউ মুখে বলতে চায় না।
এই গ্রামেই নতুন এসেছিল রহমান পরিবার। শহরের কোলাহল থেকে দূরে শান্ত জীবন কাটানোর আশায় তারা এই পুরনো বাড়িটা কিনেছিল। বাড়িটার বয়স অন্তত দেড়শো বছর হবে—দেয়ালের রং উঠে গেছে, কাঠের মেঝে চাপ দিলেই কাঁপে, আর জানালার কাঁচে যেন সবসময় কুয়াশা লেগে থাকে।
প্রথম দিন থেকেই ছোট ছেলে ইমরান অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে। ইমরানের বয়স মাত্র সাত। শান্ত, চুপচাপ ছেলে। কিন্তু নতুন বাড়িতে আসার পর থেকেই সে রাতে ঘুমাতে চাইত না। বারবার বলত—“ও আছে।” মা-বাবা ভেবেছিল নতুন জায়গা, তাই ভয় পাচ্ছে। কিন্তু কয়েকদিন পর বিষয়টা আর সাধারণ মনে হলো না।
এক রাতে, ইমরানের মা আয়েশা ঘুম থেকে উঠে দেখে—ইমরান বিছানার এক কোণে বসে আছে, কম্বলটা বুক পর্যন্ত টেনে ধরে, আর তার চোখ দুটো একদম স্থির। সে তাকিয়ে আছে ঘরের এক অন্ধকার কোণে। “কি হয়েছে?”—আয়েশা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। ইমরান ধীরে ধীরে বলল— “ওখানে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে… সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।” আয়েশা তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেল না। কিন্তু ইমরানের চোখের সেই ভয়… সেটা অভিনয় ছিল না।
পরের দিন সকালে, পাশের বাড়ির বৃদ্ধা মিসেস হেন্ডারসনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আয়েশা casually এই কথাটা বলেছিল। বৃদ্ধা হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। “তোমরা কোন ঘরে থাকো?”—তিনি জিজ্ঞেস করলেন। যখন আয়েশা বলল, তারা উপরের ডানদিকের ঘরে থাকে—বৃদ্ধার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “ওই ঘরে আগে… একটা ছেলে থাকত।” “থাকত মানে?” বৃদ্ধা একটু থেমে বললেন— “অনেক বছর আগে… সেই ছেলেটা একদিন রাতে… আর সকালে তাকে পাওয়া যায়নি।” “মানে হারিয়ে গিয়েছিল?” বৃদ্ধা মাথা নেড়ে বললেন— “না… বিছানার নিচে তার শরীর পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু… অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কেউ জানে না সে কিভাবে মারা গিয়েছিল। তার চোখ দুটো খোলা ছিল… ঠিক যেন সে কাউকে দেখছিল।”
সেই রাতেই ঘটনা ঘটল। রাত প্রায় ৩টা। হঠাৎ একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে পুরো ঘরটা ভরে দিল। জানালা বন্ধ, দরজা বন্ধ—তবুও বাতাস যেন কোথা থেকে ঢুকছে। ইমরান হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বসে পড়ে। তার নিঃশ্বাস দ্রুত, চোখ দুটো বড় বড়। সে ধীরে ধীরে কম্বলটা মুখ পর্যন্ত টেনে নেয়। তারপর ফিসফিস করে বলে— “আজ ও কাছে এসেছে…” আয়েশা ঘুম ভেঙে উঠে বসে। “কে এসেছে?” ইমরান উত্তর দেয় না। শুধু তাকিয়ে থাকে… ঠিক বিছানার সামনে। সেই মুহূর্তে আয়েশা প্রথমবার কিছু অনুভব করল। ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ অনেক কমে গেছে। আর একটা অদ্ভুত গন্ধ—পুরনো, ভেজা কাঠের মতো। তারপর… সে দেখল। বিছানার সামনে… ছায়ার মতো একটা অবয়ব। একটা ছোট ছেলে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়… আর সম্পূর্ণ কালো। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। সে শুধু তাকিয়ে আছে। ঠিক যেমন ইমরান বলেছিল। আয়েশা চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। ছেলেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। ইমরান কম্বলের ভেতরে ঢুকে গেল। তার শরীর কাঁপছে। ছেলেটা বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার মাথা একটু কাত হয়ে গেল… যেন সে কিছু বুঝতে চাইছে। তারপর… সে নিচু হয়ে তাকাল। সরাসরি কম্বলের ভেতরে। ইমরান তখন চিৎকার করে উঠল। আলো জ্বালানোর সাথে সাথে সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেল।
পরদিন সকালে, তারা সিদ্ধান্ত নেয়—এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু যাওয়ার আগে, রহমান সাহেব বাড়ির পুরনো নথিপত্র দেখতে শুরু করেন। সেখানে তিনি একটি পুরনো ডায়েরি পান। ডায়েরিটা সেই ছেলেটার—নাম ছিল এলিয়ট। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিল— “ও প্রতিদিন রাতে আসে। প্রথমে দূরে দাঁড়িয়ে থাকত। এখন কাছে আসে। ও বলে, আমি যদি কম্বলের নিচে লুকাই… তাহলে সে আমাকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু গতকাল… সে আমার কম্বলের ভেতরে তাকিয়েছিল…” এরপর আর কিছু লেখা নেই। শুধু একটা আঁকিবুঁকি— একটা ছেলে… কম্বল জড়িয়ে বসে আছে… আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা ছায়া।
রহমান পরিবার সেদিনই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ না। তিন মাস পরে, নতুন একটা পরিবার সেই বাড়িতে ওঠে। তাদের ছোট মেয়েটি প্রথম রাতেই বলেছিল— “মা… একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।”

0 Comments