লোকেশন: ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া 🇦🇹
সময়: ১৯১২ সালের শীতকাল
ভিয়েনার পুরোনো শহরের প্রান্তে একটা বাড়ি আছে—আজও আছে। লোকেরা সেটাকে “Haus der Schatten” বলে ডাকে—মানে, ছায়ার বাড়ি। জায়গাটা এখন বন্ধ, কিন্তু একসময় ওটা ছিল এক ধনী পরিবারের বসবাসের স্থান। আশেপাশের মানুষ এখনো সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর।
আমি প্রথম এই গল্পটা শুনি এক বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান, হারমান গ্রুবারের কাছ থেকে। তিনি বলেছিলেন, “এই ঘটনাটা যদি গল্প মনে হয়, তাহলে ভুল করবে। কারণ আমি নিজে সেই বাড়ির নথিপত্র দেখেছি।”
সবকিছুর শুরু ১৯১২ সালের ডিসেম্বর মাসে। তুষারপাত হচ্ছিল লাগাতার। শহরের বেশিরভাগ মানুষ তখন ঘরের ভিতরে, আগুন জ্বালিয়ে বসে আছে। কিন্তু সেই বাড়ির দ্বিতীয় তলার এক জানালায় তখন প্রায়ই দেখা যেত এক মেয়েকে—যে কখনো নড়ত না, শুধু তাকিয়ে থাকত। লোকেরা প্রথমে ভাবত, হয়তো বাড়ির কোনো সদস্য। কিন্তু সমস্যা হলো—সেই বাড়িতে তখন কেউ থাকত না।
এই বাড়ির মালিক ছিলেন এক মহিলা—এলিজা রোহমান। তিনি ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় লোককথা নিয়ে গবেষণা করতেন। তার স্বামী মারা গিয়েছিলেন আগেই, আর কোনো সন্তান ছিল না। লোকেরা বলত, এলিজা অদ্ভুত ধরনের মানুষ ছিলেন। তিনি দিনের বেলায় খুব স্বাভাবিক থাকলেও, রাতের বেলায় তার বাড়ির ভিতর থেকে অদ্ভুত শব্দ শোনা যেত। কখনো যেন কেউ ফিসফিস করছে, কখনো যেন কাঁচে নখ দিয়ে আঁচড় কাটার শব্দ।
একদিন হঠাৎ করে এলিজা নিখোঁজ হয়ে যান। পুলিশ আসে, তদন্ত হয়, কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ঘরের ভিতরে সব কিছু ঠিকঠাক—কোনো লড়াইয়ের চিহ্ন নেই, কোনো চুরি হয়নি। শুধু একটি জিনিস পাওয়া যায়—একটা পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরিটা ছিল এলিজার নিজের লেখা। প্রথম দিকের পাতাগুলোতে ছিল তার গবেষণার নোট। কিন্তু শেষের দিকের পৃষ্ঠাগুলো ধীরে ধীরে অদ্ভুত হয়ে উঠছিল। তিনি লিখেছিলেন— “ওরা জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটা কল্পনা। কিন্তু এখন আমি নিশ্চিত—ওরা আমাকে দেখছে।” “গতরাতে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি, কেউ জানালায় হাত রেখেছে। আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা… আর নখগুলো… যেন কাঁচের উপর ঘষা লাগছে।” “ওরা আমার নাম জানে।”
ডায়েরির শেষ পাতায় শুধু একটা লাইন ছিল— “আজ আমি জানালাটা খুলব।” এর পরেই এলিজা নিখোঁজ।
এই ঘটনার পর বাড়িটা সিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আশেপাশের মানুষ লক্ষ্য করে—দ্বিতীয় তলার সেই জানালায় মাঝে মাঝে একটা মেয়েকে দেখা যায়। তার চুল এলোমেলো, মুখ ফ্যাকাশে, আর চোখ দুটো… সম্পূর্ণ সাদা। সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো কখনো হাত রেখে দেয় কাঁচের ওপর। যেন বাইরে বেরোতে চাইছে।
১৯২৩ সালে, এক তরুণ সাংবাদিক—মার্কাস হেল—এই রহস্য নিয়ে রিপোর্ট করতে যান। তিনি সেই বাড়িতে এক রাত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তার রিপোর্টের কিছু অংশ এখনো সংরক্ষিত আছে— “রাত ২টার দিকে আমি প্রথম শব্দটা শুনি। যেন কেউ খুব আস্তে আস্তে কাঁচে টোকা দিচ্ছে।” “আমি ভেবেছিলাম বাইরে কেউ আছে। কিন্তু যখন জানালার কাছে গেলাম… তখন দেখলাম—ওটা বাইরে নয়, ভেতর থেকেই আসছে।” “কাঁচের ওপাশে একটা মুখ দেখা গেল। কিন্তু সেটা আমার দিকে তাকাচ্ছিল না… বরং আমার পেছনে তাকাচ্ছিল।”
এরপর রিপোর্টটা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায়। মার্কাস হেলকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বছরের পর বছর কেটে যায়। বাড়িটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। কেউ আর সেখানে যেতে সাহস করে না। কিন্তু ১৯৭৮ সালে, কিছু কিশোর-কিশোরী সাহস করে বাড়ির ভিতরে ঢোকে। তারা মজা করতে গিয়েছিল—“ভূতের বাড়ি” দেখে আসবে বলে। তাদের মধ্যে একজন, লুকাস, পরে একমাত্র বেঁচে ফিরে আসে। তার কথা অনুযায়ী— “আমরা সবাই মিলে দ্বিতীয় তলায় উঠেছিলাম। তখন সবকিছু ঠিক ছিল।” “হঠাৎ করে একটা মেয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।” “আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো কেউ আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।” “কিন্তু যখন ও ঘুরে তাকাল… তখন বুঝলাম—ও মানুষ না।” “ওর চোখ ছিল পুরো সাদা।” “ও হাসছিল… কিন্তু সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না।”
লুকাসকে পরে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে আজও একই কথা বলে— “ও এখনো জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।”
আজও, মাঝে মাঝে সেই বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে কিছু মানুষ দাবি করে—তারা জানালায় কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। কেউ কেউ বলে, যদি তুমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকো… তাহলে সে ধীরে ধীরে তার হাত কাঁচের ওপর রাখবে। আর যদি তুমি হাত না সরাও— তাহলে কাঁচের ওপাশ থেকে একটা ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করবে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশটা এখনো বলা হয়নি। কিছু মানুষ দাবি করে— যারা সেই মেয়েটার চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকে… তাদের পরদিন থেকে নিজের বাড়ির জানালার বাইরে একই মুখ দেখা যায়।
এখন প্রশ্ন হলো— এলিজা কি সত্যিই জানালাটা খুলেছিল? আর যদি খুলে থাকে— তাহলে সে কি বেরিয়ে এসেছে… নাকি অন্য কেউ ঢুকে পড়েছে?

0 Comments