রাত তখন ঠিক সাড়ে আটটা। আমাদের গ্রামের বাজার থেকে ফেরার সময়। হঠাৎই আকাশটা অস্বাভাবিক রকম অন্ধকার হয়ে গেল। বৃষ্টি নামার লক্ষণ নেই কিন্তু বাতাস ভার মনে হচ্ছিল। চারপাশে যেন কেউ নিঃশ্বাস চেপে রেখেছে। আমি তখন একাই ছিলাম। বাজার থেকে বাড়ি যেতে হলে একটা পুরনো মাটির বাঁধের ওপর দিয়ে যেতে হয়। বাঁধের একপাশে বড় খাল আর একপাশে নিচু ধানক্ষেত। দিনের বেলায় এই রাস্তা দিয়ে মানুষ যায়, গরু যায়, সাইকেল যায়। কিন্তু রাত হলে কেউ এই বাঁধে ওঠে না। আমি উঠেছিলাম কারণ এই রাস্তা না নিলে আমাকে প্রায় ৩কিলোমিটার ঘুরে যেতে হতো। বাঁধে পা দিতেই টের পেলাম আজ পরিবেশটা অন্যরকম। খুব বেশি চুপ। সাধারণত এই সময় খালের দিক থেকে ব্যাঙ ডাকে, ঝোপে ঝিঝি পোকা শব্দ করে। আজ কিছুই নেই। আমি ধরে ধরে হাঁটছিলাম। হঠাৎ পেছন দিক থেকে খুব পরিষ্কার একটা কন্ঠ শোনা গেল। ভাই। একটু দাঁড়াও আমি থমকে গেলাম গ্রামে। কেউ আমাকে ভাই বললে আমি চিনতে পারি কিন্তু এই গলাটা আমার পরিচিত মনে হলো না। পেছনে তাকালাম বাঁধের উপর একটু দূরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে বয়স বেশি না, বড়জোর ১২ কি ১৩। গায়ে নল রঙের হাফ, জামা,কাদা, মাখা, প্যান্ট। আমি সস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ভাবলাম কোন গ্রামের ছেলে হয়তো। আমি বললাম কি হয়েছে? ছেলেটা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, আমাকে একটু ওপারে নামিয়ে দেবেন। আমি অবাক হলাম, ওপারে মানে খালের ওপারে। আমি বললাম, এইখান দিয়ে নামা যায় না। সামনে গিয়ে শাকও আছে। ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে বলল না। এখান দিয়েই আমি খেয়াল করলাম, সে কথা বলছে ঠিকই কিন্তু তার মুখে কোন ভাব নেই। চোখ দুটো স্থির। আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, আমি পারব না। সামনে। যাও, আমি হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু ২ কদম যেতেই পেছন থেকে আবার সেই গলা, ভাই, আপনি তো আমাকে চিনেন। আমি থমকে গেলাম পেছনে তাকিয়ে বললাম, আমি তোকে চিনি। ছেলেটা খুব আস্তে হেসে বলল, আপনি আমাকে খাল থেকে তুলেছিলেন। আমার বুক ধক করে উঠল, আমি জবনে কাউকে খাল থেকে তুলেছি বলে মনে পড়ছে না। আমি বললাম, কি বলছিস? সে এবার আমার দিকে ১ পায়ে গেল। বাঁধের উপর আলো কম ছিল। কিন্তু আমি পরিষ্কার দেখলাম তার জামার নিচের অংশ ভিজে। সে বলল, আপনি ভুলে গেছেন। আমি আবার ১ কদম পেছালাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম তুই কোন বাড়ির ছেলে? সে একটু থেমে বলল, আমি তো আর বাড়িতে থাকি না। এই কথাটা শোনার পর আমার বুকের ভেতর হালকা শতল স্রোত বয়ে গেল। আমি কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলাম। বললাম, তোর বাবা মা কোথায়? ছেলেটা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, খালের ভেতর। আমি চমকে উঠলাম। ঠিক তখনই খালের দিক থেকে হালকা পানির শব্দ এলো। ছপ ছপ আমি পাশ ফিরে তাকালাম। অন্ধকার পানিতে কিছু নড়ছে। আমি আবার ছেলেটার দিকে তাকালাম। সে আর আগের জায়গায় নেই। সে এখন বাঁধের একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে খালের ঠিক পাশে। সে বলল, দেখুন আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিচের দিকে তাকালাম। খালের পানিতে আমি একটা ছোট অবয়ব দেখতে পেলাম। মুখোপরে চুল পানিতে ভাসছে। ঠিক তখনই আমার মাথার ভেতর একটা ঝাঁকুনি খেলো। অনেক বছর আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমাদের পাশের গ্রামের ১ ছেলে বর্ষার সময় খালে পড়ে মারা গিয়েছিল। তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল অনেক পরে। লোকজন বলেছিল যে তাকে প্রথম দেখেছিল। সে নাকি অনেকদিন অসুস্থ ছিল। আমি তখন ছোট ছিলাম। কিন্তু খবরটা মনে ছিল আমি। কাঁপতে কাঁপতে বললাম তুই কি? ছেলেটা খুব শান্তভাবে বলল, হ্যাঁ। আমার বুকের ভেতর সব বাতাস যেন একসাথে বের হয়ে গেল। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম সে আমাকে কেন চিনতে পারছে। আমি সেদিন খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। লাশ যখন তোলা হচ্ছিল আমি তাকে স্পর্শ করিনি। কিন্তু আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম খুব কাছ থেকে। ছেলেটা হঠাৎ বলল, আপনি তখন তাকিয়ে ছিলেন। আমার গলা আটকে গেল। সে বলল, সব চলে গিয়েছিল। আপনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, আমি কিছু করিনি। সে মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, তাইতো আপনার কাছে এসেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি চাও? সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, একটু পথ আমি বুঝলাম না। সে বলল, আমি পারিনা। আমি বললাম কোথায় যেতে। সে খালের দিকে তাকালো। তারপর বাঁধের শেষ মাথার অন্ধকারের দিকে। সে বলল, ওখানে তখন আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমি মুখে মুখে দোয়া পড়তে শুরু করলাম। যা মনে আসছিল। সে হঠাৎ একদম চুপ করে গেল। আমি পড়া থামালাম না। ঠিক তখন দূরে গ্রামের মসজিদ থেকে এশার আজানের প্রথম তকবর ভেসে এল। আল্লাহু আকবার এই শব্দটা শোনার সাথে সাথে ছেলেটার শররটা কেমন ঝাঁকুনি খেলো। সে খুব ধরে বলল, আজ না। আমি থমকে তাকিয়ে ছিলাম। সে আবার বলল, আজ না। তারপর সে ধরে ধরে খালের দিকে নামতে শুরু করল। মাটিতে ৯ সরাসরি নিচে। আমি দেখলাম সে পানিতে নামছে। কিন্তু পানিতে কোন শব্দ হচ্ছে না। সে নামতে নামতে একবার আমার দিকে তাকালো। তার চোখে তখন কোন অনুরোধ নেই, শুধু ক্লান্তি। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলাম। সে পুরোপুরি পানির ভেতর মিলিয়ে গেল। খালের পানি আবার স্থির হয়ে গেল। আমি তখন বুঝলাম, আমি যদি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকি, আমি নিজেই ভেঙে পড়বো। আমি দৌড় দিলাম বাঁধের শেষ মাথা পেরিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়লাম। সেদিন রাতে আমার জ্বর এসেছিল ঘোরের মধ্যে। বারবার শুনছিলাম, ভাই একটু দাঁড়াও। পরদিন সকালে আমি আরেক রাস্তা দিয়ে বাজারে গেলাম। আমি এখনো সেই বাঁধ ব্যবহার করি না। কারণ আমি জানি ওই ছেলেটা পথ চায়, কিন্তু সে পথ কোন জবিত মানুষ দেখাতে পারে না।