লেখা-মৌমি
দুইদিন আগে মাসির বাড়ি গিয়েছিলাম,অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই তাই ভাবলাম ঘুরে আসি।আমার মাসি বেসরকারি একটি নার্সিংহোমে হেড নার্স।বেশিরভাগই ব্যাস্ত থাকেন,দুইদিন ছুটি নিয়েছেন তাই সেই সুযোগে দেখা করতে যাই।যখনই মাসির কাছে গেছি তার মুখে একটা মৃদু হাসি লেগে থাকতেই দেখেছি।এত পরিশ্রম করার পরেও ক্লান্তি ভাব তাকে কাবু করতে পারেনা,তবে এইবার গিয়ে সেই হাসি মুখটায় একটু বদল ও দুঃশ্চিন্তা দেখলাম।
কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতে প্রথমে মাসি 'কিচ্ছু হয়নি' বলে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলেন ঠিকই তবে কিছুক্ষন পরে নিজে থেকেই তার চিন্তার কারণ বলতে শুরু করলেন।
হয়তো মাসি এই কথা গুলো কাউকে বলতে চাইছিলেন কিন্ত বলে উঠতে পারছিলেন না।
মাসি একটু গম্ভীর গলায় আমায় জিজ্ঞেস করলেন,
আচ্ছা মাম তুই কি ভুত বিশ্বাস করিস..?
কথাটা শুনে কৌতূহল বেড়ে গেল,সাথে একটু অদ্ভুত লাগলো।মাসির মুখে এমন কথা তো আগে শুনিনি।
তাড়াহুড়ো তে উত্তর দিলাম,
হ্যা..আমি সবেতেই বিশ্বাস করি।
কেন কি হয়েছে ?ভুত দেখেছ নাকি..?
মাসি একটু থেমে বললেন,
ভুত কিনা জানিনা,হতে পারে আমার মনের ভুল ....
তবে.......
তবে কি?
আরে এত ভাবার কি আছে?মনে যা আছে বলে দাও।
কিছুদিন ধরে আমার সাথে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে,আমি সেই ঘটনা গুলোকে উপেক্ষা করতে চেয়েছি বহুবার কিন্ত পারিনি।
শরীর টা এই কারণে খারাপ করছে বারবার,কাজেও মন বসছে না...
আচ্ছা..কি হয়েছে বলতো..?
কি এমন ঘটলো..?
মাসি বলা শুরু করলেন,
আমাদের নার্সিংহোমে একমাস আগে একটা অল্প বয়সের মেয়ে ভর্তি হয়েছিল।সে গায়ে আগুন দিয়েছিল।
শরীরের ৮০% পুড়ে গিয়েছিল।আমরা সকলেই জানতাম এই পেশেন্ট কে বাঁচানো সম্ভব নয়,তবুও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করি।
মেয়েটির মা জানায়,প্রেমিকের সাথে অশান্তি করে সে এই কাজ করেছে।
মেয়েটি সারাদিন সারারাত চিৎকার করতো যন্ত্রনায়।তাকে দেখলে যে কোনো মানুষেরই ভয় লাগার কথা।
মাথার চুল,মুখ,বুক,হাত,পা সব ঝলসে গেছিল।চামড়া গুলো পুড়ে ভিতরের লাল অংশ যেন বেরিয়ে আসছিল।যে রুমে তাকে রাখা হয়েছিল সেই রুমের পাশে অন্য কোনো পেশেন্ট থাকতে ভয় করছিল,তাই তাকে পিছনের দিকের কেবিনে শিফট করা হয়।
মেয়েটি সারাদিন সারারাত যন্ত্রনায় চিৎকার করতো।কি যেন বলতে চাইতো,কিন্ত ঠোঁট জিভ সব পুড়ে যাওয়াতে তার কথা বোঝা যেত না।
আমরা অনেক ধরণের পেশেন্ট দেখি তবে আমাদের নার্সিংহোমে এমন পেশেন্ট প্রথমবার দেখছিলাম,হয়তো নিজের জীবনেও এমন ভয়ঙ্কর অবস্থা হতে কাউকে দেখিনি।
নার্স আয়া সকলেই তার সামনে যেতে ভয় করতো,
মেয়েটির কেবিনে প্রবেশ করলেই একটা তীব্র পোড়া গন্ধ নাকে আসতো,তার সাথে মেয়েটির চিৎকার ও গোঙানির শব্দ।
তার মা বাবাও মেয়ের কষ্ট দেখে বলতেন যে,এই কষ্টের চেয়ে মরে যাওয়া ভালো...
আর সেটাই হলো এক সপ্তাহ পর।এক সপ্তাহ ধরে আমাদের বহু চেষ্টা আর মেয়েটির কষ্টের অবসান হলো।
যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে সে মারা গেল।
তারপর কি হলো মাসি..?
দীর্ঘ নিঃস্বাস নিয়ে মাসি বললো,
সমস্যা এর পর থেকেই শুরু হলো।মেয়েটির মারা যাওয়ার দুই দিন পর সেই কেবিনে অন্য এক পেশেন্ট কে ভর্তি করা হয়।
সেই মহিলা বয়সজনিত কিছু কারণে ভর্তি হয়েছিলেন।
আমার দিনের শিফট ছিল তখন।পরের দিন গিয়ে শুনি,
উনি এক রাত সেই কেবিনে কাটানো মাত্রেই কেমন যেন অশান্তি শুরু করে দিয়েছেন।
উনি কাঁদতে কাঁদতে নার্সিংহোমের সকলকে রিকোয়েস্ট করছিলেন সেইখানে নাকি ভুত আছে।উনি ওখানে থাকতে চান না।
ওনার কথার গুরুত্ব সেভাবে কেউ দেয়নি,কারণ ওনার বাড়ির লোক জানিয়েছে উনি নাকি একা থাকতে পারেননা।সেই ক্ষেত্রে হয়তো বাড়ি যাওয়ার জন্যেই এগুলো করছিলেন ,সেটাই সবার ধারণা ছিল।তাছাড়া হসপিটাল হোক বা নার্সিংহোম কেই বা এখানে থাকতে চায়।
পরের দিন রাতেও নাকি উনি পুরো নার্সিংহোম চিৎকার করে মাথায় তুলেছিলেন।উনি নাকি বারবার বলছিলেন,ওনার ভয় করছে।ওনার দম আটকাচ্ছে।
ওনার নাকে নাকি পোড়া গন্ধ আসছে।
এগুলো আমি পরের দিন জানতে পারি ডিউটিতে গিয়ে।
ওনার কথায় কেউ বিশ্বাস করিনি তখন এমন কি এইসব কথা শুনে আমারও মনে হয়েছিল,উনি বাড়ি ফেরার জন্যে হয়তো এমন করছেন।
তবে আমি বুঝিনি সেই ঘটনার সাক্ষী খুব শীঘ্রই আমাকেও হতে হবে।
পরের রাত থেকেই আমার নাইট ডিউটি শুরু হলো,
সেই বয়স্ক মহিলার কান্ড দেখে তার বাড়ির লোক তাকে সকালেই বাড়ি নিয়ে গেছে।
যদিও বা আমি ওনার কথায় বিশ্বাস করিনি তবুও একটা বিষয় অদ্ভুত লেগেছিল,
উনি কেন বলছিলেন পোড়া গন্ধ পাচ্ছেন..?
সেই একই রুমে আগে সেই অল্প বয়সী মেয়েটিকে রাখা হয়েছিল ঠিকই কিন্ত সে বিষয়ে এই বয়স্ক মহিলা কিছুই জানতেন না,তাহলে উনি এই কথা বললেন কেন..?
তাছাড়া পোড়া গন্ধ আসার কোনো প্রশ্নই আসেনা,
সেই মেয়েটি মারা যাওয়ার পর কেবিনটি ভালো ভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে।
আমি নিজেও একবার গিয়ে দেখে এসেছি।
ভুতে সেভাবে বিশ্বাস করতাম না,তবে জানিনা কেন এই কথা টা ভাবা মাত্রেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।
তবে আসল ঘটনা ঘটতে এখনো বাকি ছিল...
পরের দিন আবার আমার নাইট শিফট ছিল।
আমি আমার কাজ শুরু করি রোজকার মতোই।
ওই বয়স্ক মহিলা চলে যাওয়ার পর কেবিন টি বন্ধ করেই রাখা হয়েছিল।
রাত তখন দুটো বেজে দশ,আমি আমার রুমে বসে কাজ করছি।এমন সময় হটাৎ ই কানে আসে কারোর গোঙানির শব্দ।
প্রথমে অত গুরুত্ব দিইনি।
কত পেশেন্ট ই তো থাকে,তাদের মধ্যেই হয়তো কেউ।
তবে শব্দটা ক্রমশ হয়েই চলেছিল।
রুম থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকালাম,সেরকম কিছু দেখতে পেলাম না।
কিছুক্ষন পর নিজে থেকেই শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।
সেই রাতে এতটুকুই হয়েছিল।
তারপরের রাতে কাজে গিয়ে দেখি,বেশিরভাগ নার্স ই ছুটিতে রয়েছে।
দিনের শিফট সেরে অন্য হেড আমাকে নতুন কিছু পেশেন্ট এর ডিটেইলস দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
আমি আমার ডেস্কে বসে কাজ শুরু করি।
রাত তখন একটা হবে,
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একটু পায়চারী করছিলাম করিডরে।
হটাৎ করে নাকে একটা ভীষণ রকম গন্ধ এলো,যেন ঠিক মানুষ পোড়া সাথে সেই গোঙানির শব্দ।
যতদূর জানি নতুন পেশেন্ট তিনজন ভর্তি হয়েছে তবে তাদের ওপরের ফ্লোরে রাখা হয়েছে,কিন্তু শব্দ টা আসছে পেছনের কেবিন গুলো থেকে।
করিডর দিয়ে হাটতে হাটতে হটাৎ করে মনে হলো আমার পিছন পিছন কেউ আসছে।কারোর পায়ের শব্দ শুনলাম স্পষ্ট।তবে পিছনে ফিরে কাউকেই দেখতে পেলাম না।
এদিকে ওই পোড়া গন্ধ টা যেন বেড়েই চলেছে ,তবে তার উৎস কেউ জানেনা।
একবার একজনকে ডেকেও জিজ্ঞেস করলাম তবে সে খুব একটা গুরুত্ব দিল না,শুধু দুবার নাক টেনে বললো,
কই গো দিদি, কোনো গন্ধই যে পাচ্ছিনা।
আমি ভাবলাম হয়তো আমার মনের ভুল বা নাকের ভুল...
সেরাত কেটে গেল এই ভাবেই।
তার পরের রাতে আবার সেই একই ঘটনা ঘটলো,এইবার আমি শিওর ছিলাম এটা আমার মনের ভুল নয়।
পোড়া গন্ধটা যেন আরো বেশি তীব্র আর সাথে কারোর গোঙানির শব্দ।
শব্দের উৎস খুঁজতে পিছনের কেবিন গুলো দেখতে লাগলাম।
তবে সেইরকম কোনো কিছুই চোখে পরলো না।
এরপর শেষ কেবিনের দিকে এগোলাম,যেখানে সেই মেয়েটিকে রাখা হয়েছিল।
আমার মনে সাহস যথেষ্ট ছিল তবে কেন জানিনা মনটা একটু ঘাবড়াচ্ছিল।
কোথাও যেন একটা ভয় কাজ করছিল।
যাই হোক,মনে সাহস জুগিয়ে কেবিনটি খুলতেই নাকে এলো তীব্র পোড়া গন্ধ।
নিজেরই যেন নিজেকে বিশ্বাস হলোনা...
এটা কিকরে সম্ভব...এই কেবিন থেকে এমন গন্ধ আসার তো কথা নয় কোনো ভাবেই।কেবিন তো পরিষ্কার করা হয়েছিল.....তাহলে কেন..?
ভাবতে ভাবতেই সেই অন্ধকার কেবিন থেকে কেমন যেন একটা শব্দ আসতে শুনলাম।কেউ যেন কিছু বলতে চাইছে।
মুহূর্তের মধ্যেই গলা শুকিয়ে এলো,শরীরের লোম গুলো সব দাঁড়িয়ে গেল।সমস্ত শক্তি সাহস যেন উড়ে গেল।
এইভাবে ওই মেয়েটি কথা বলতো বা শব্দ করতো।
হটাৎ করেই ওই বয়স্ক মহিলার কথাটি যেন কানে বেজে উঠলো,
এই কেবিনে ভুত আছে...একটা পোড়া মেয়ের ভুত।
কথাটা শুনে আমি একটু চিন্তিত হলাম,তারপর মাসিকে বললাম,তার পর তুমি কি করলে..?
কোনোরকম শক্তি সঞ্চয় করে সেখান থেকে সরে এলাম।পা যেন সঙ্গ দিচ্ছিল না আমার।
আচ্ছা মাসি তুমি তো দিনের বেলার ডিউটি করতে পারো,তাহলে তো এই সমস্যা আর হয়না।
সেটা শুনে মাসি বললেন,
উনিও সেটাই ভেবেছিলেন।তাই দুইদিন ধরে দিনের ডিউটি করছেন,তবে লাভ কিছু হয়নি।সেই পোড়া গন্ধ দিনের আলোতেও তার পেছন ছাড়ছে না।
এখন তো নার্সিং হোমের আরো কিছু মানুষজন ও সেই ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।
সেদিন আমি বাড়ি ফিরে আসি।সে রাতেও মাসির নাইট ডিউটি ছিল।
পরের দিন ভোর বেলা মা ফোন করে জানায়,মাসি নাকি নার্সিংহোমের বাথরুমে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে সেটার কারণ কি এখনো জানা হয়নি.....

0 Comments