লেখক: অভিজিৎ রায়
সকালের নরম আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে, ঘরের মেঝেতে হালকা ছায়া ফেলে। রাহুলের ঘুম ভাঙলো যথারীতি সাতটায়। সে বিছানা থেকে উঠে বসলো, চোখ ডলতে ডলতে। তার ছোট্ট ফ্ল্যাটটা কলকাতার একটা পুরনো এলাকায়, যেখানে রাস্তাগুলো সরু আর বাড়িগুলোতে ইটের গাঁথুনি এখনও দৃশ্যমান। রাহুল একা থাকে, তার বাবা-মা গ্রামে, আর সে এখানে একটা ছোট অফিসে চাকরি করে। জীবনটা সাধারণ, কোনো উত্তেজনা নেই—সকালে চা বানিয়ে খাওয়া, অফিস যাওয়া, ফিরে এসে টিভি দেখা বা বই পড়া।
আজ সকালে সে রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের পাতা খুঁজছিল, যখন তার চোখ পড়লো টেবিলের উপর রাখা পুরনো ঘড়িটায়। এটা তার দাদুর জিনিস ছিল, যা সে সম্প্রতি গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছে। দাদু মারা যাওয়ার পর, তার মা বলেছিলেন, "এটা তোর দাদুর খুব প্রিয় ছিল। নিয়ে যা, ঘরে রাখবি।" ঘড়িটা পুরনো, কাঠের ফ্রেমে, সোনালি রঙের ডায়াল, আর লম্বা পেন্ডুলাম যা টিকটিক করে চলে। রাহুল এটাকে টেবিলে রেখেছে, কিন্তু এখনও চালু করেনি। "আজ চালিয়ে দেখি," সে মনে মনে ভাবলো।
সে ঘড়িটা খুলে দেখলো, ভিতরে ধুলো জমে আছে। একটা নরম কাপড় দিয়ে সাফ করে, চাবি ঘুরিয়ে দিলো। টিক... টিক... শব্দটা শুরু হলো, ধীরে ধীরে, যেন ঘড়িটা জেগে উঠছে দীর্ঘ ঘুম থেকে। রাহুল হাসলো, "দাদু, তোমার ঘড়ি এখনও চলে। ভালো লাগছে শুনতে।" সে চা বানিয়ে নিয়ে টেবিলে বসলো, খবরের কাগজ খুলে। টিকটিক শব্দটা পটভূমিতে চলছে, সাধারণ, কিন্তু কোথাও যেন একটা পরিচিত অনুভূতি আছে। দাদুর বাড়িতে এই শব্দটা সবসময় শোনা যেত, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়।
অফিস যাওয়ার সময় হলো। রাহুল জামা-প্যান্ট পরে, ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। ফ্ল্যাটের দরজা লক করার সময় সে পেছনে তাকালো—ঘড়িটা এখনও টিকটিক করছে, ঘরের নীরবতায় স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। "ভালো থাকিস," সে মনে মনে বললো, যেন ঘড়িটা একটা জীবন্ত জিনিস। রাস্তায় বেরিয়ে সে অটো ধরলো। অফিসে পৌঁছে তার কলিগ সুমনকে দেখলো, যে তার ডেস্কের পাশে বসে। "কী রে, আজ একটু অন্যমনস্ক লাগছে?" সুমন জিজ্ঞেস করলো, কফি হাতে নিয়ে। রাহুল হাসলো, "না রে, শুধু দাদুর একটা পুরনো ঘড়ি নিয়ে এসেছি গ্রাম থেকে। চালু করেছি আজ, টিকটিক শব্দটা মনে করিয়ে দিচ্ছে পুরনো দিনগুলো।" সুমন চোখ কুঁচকে বললো, "পুরনো ঘড়ি? সাবধান, ওসব জিনিসে কখনও কখনও অদ্ভুত কিছু লেগে থাকে। আমার মামার একটা ছিল, রাতে থেমে যেত নিজে নিজে।" রাহুল হেসে উড়িয়ে দিলো, "আরে, তুই তো সবসময় ভূতের গল্প বলিস। এটা তো শুধু একটা ঘড়ি।"
দুপুরে লাঞ্চের সময় রাহুলের মনে হলো, ঘড়িটা কেমন চলছে? সে ফোন করে তার প্রতিবেশী আন্টিকে বললো, "আন্টি, আমার ফ্ল্যাটে একটা ঘড়ি চালু রেখে গেছি। যদি শব্দটা বিরক্ত করে, তাহলে বলো।" আন্টি হেসে বললেন, "না বাবা, কোনো শব্দ শুনিনি। তুমি চিন্তা কোরো না।" রাহুল স্বস্তি পেলো। অফিসের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় ফিরলো। দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই টিকটিক শব্দটা শোনা গেল, কিন্তু কোথাও যেন একটু জোরালো লাগছে। সে ঘড়িটা দেখলো—পেন্ডুলামটা দুলছে, সময় ঠিক আছে। "ভালো চলছে," সে বললো নিজেকে। রাতের খাবার বানিয়ে খেলো, টিভি চালিয়ে বসলো। শব্দটা পটভূমিতে চলছে, কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে হলো যেন শব্দটা একটু অনিয়মিত। টিক... টিক... কখনও একটু দেরি করে, কখনও তাড়াতাড়ি। "হয়তো চাবি ঘুরাতে হবে," সে ভাবলো।
রাত দশটায় ঘুমাতে যাওয়ার সময় সে ঘড়িটা থামিয়ে দিলো না। বিছানায় শুয়ে সে শুনতে পেলো শব্দটা, দূর থেকে আসছে, কিন্তু স্পষ্ট। তার মনে পড়লো দাদুর কথা—দাদু বলতেন, "এই ঘড়ি আমার সাথে অনেক স্মৃতি রাখে। রাতে শুনলে মনে হয় কেউ কথা বলছে।" রাহুল হাসলো, চোখ বুজলো। কিন্তু মাঝরাতে, যখন ঘর অন্ধকার, শব্দটা যেন আরও কাছে এলো। টিক... টিক... তার মনে হলো যেন কেউ পায়ের শব্দ করছে, ধীরে ধীরে। সে চোখ খুলে তাকালো—ঘর খালি, শুধু ঘড়িটা। "ভুলভাল," সে বললো নিজেকে, আবার ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু সকালে উঠে তার মনে একটা অস্বস্তি রয়ে গেল, যেন শব্দটা শুধু সময় মাপছে না, কিছু বলতে চাইছে।
সকালে চা খেতে খেতে সে ঘড়িটা দেখলো—সময় ঠিক, কিন্তু পেন্ডুলামের দোলা যেন একটু ভারী। সে অফিসে গিয়ে সুমনকে বললো, "রাতে ঘড়ির শব্দটা একটু অদ্ভুত লাগলো। যেন অনিয়মিত।" সুমন চোখ বড় করে বললো, "দেখ, আমি বলেছিলাম। পুরনো জিনিসে কখনও কখনও সমস্যা থাকে। চেক করিয়ে নে।" রাহুল বললো, "হয়তো মেকানিজমটা পুরনো। ঠিক করে নেব।" কিন্তু তার মনে একটা ছোট্ট সন্দেহ জাগলো, যেন ঘড়িটা শুধু যান্ত্রিক নয়। সন্ধ্যায় ফিরে এসে সে ঘড়িটা খুলে দেখলো—ভিতরে সব ঠিক, কিন্তু ধুলোর মধ্যে একটা পুরনো ছবি পড়ে আছে, দাদুর যৌবনের। "এটা কী করে এলো?" সে অবাক হয়ে ভাবলো। ছবিটা তুলে রাখলো, কিন্তু শব্দটা চলতে থাকলো, ধীরে ধীরে তার মনের মধ্যে ঢুকে পড়ছে।
রাতে আবার ঘুমাতে যাওয়ার সময়, শব্দটা যেন আরও স্পষ্ট। টিক... টিক... তার মনে হলো যেন কেউ ফিসফিস করছে, দূর থেকে। সে উঠে বসলো, আলো জ্বালালো—ঘর খালি। "এটা আমার মনের ভুল," সে বললো উচ্চস্বরে, যেন নিজেকে শোনাতে। কিন্তু ঘুম আসতে দেরি হলো, আর সকালে উঠে তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। অফিসে গিয়ে সে অন্যমনস্ক, কাজে ভুল করছে। সুমন জিজ্ঞেস করলো, "কী হয়েছে রে? রাতে ঘুম হয়নি?" রাহুল বললো, "হ্যাঁ, ঘড়ির শব্দটা বিরক্ত করছে। আজ থামিয়ে দেব।" কিন্তু ফিরে এসে সে থামালো না, যেন কিছু একটা তাকে টানছে। শব্দটা চলছে, আর তার মনে একটা অজানা অস্বস্তি বাড়ছে, ধীরে ধীরে।
সকালের আলোটা আজ একটু ম্যাড়মেড়ে লাগছে, জানালার পর্দা দিয়ে ছেঁকে আসা ধূসর রশ্মি ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন কোনো অদৃশ্য ছায়া মিশে আছে। রাহুল বিছানা থেকে উঠে বসলো, তার চোখের নিচে গত রাতের অস্বস্তি এখনও লেগে আছে—কালো দাগের মতো। সে হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালাতে গিয়ে থমকে গেল, কারণ টিক... টিক... শব্দটা এখনও চলছে, ঘরের নীরবতায় স্পষ্ট, যেন রাতভর থামেনি। ঘড়িটা টেবিলের উপর রাখা, পেন্ডুলামটা দুলছে ধীরে ধীরে, কিন্তু আজ সকালে শব্দটা যেন একটু ভারী, যেন কোনো অদৃশ্য ওজন টেনে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিটা টিক। রাহুলের মনে হলো, এটা শুধু যান্ত্রিক শব্দ নয়, যেন কোনো নিঃশ্বাসের ছন্দ, দূর থেকে আসা। সে উঠে দাঁড়ালো, পায়ের তলায় মেঝের ঠান্ডা টাইলসটা ছুঁয়ে যেন একটা ঝাঁকুনি দিলো তার শরীরে। "আজ থামিয়ে দেব," সে মনে মনে বললো, কিন্তু হাত বাড়াতে গিয়েও থেমে গেল। ঘড়িটার ডায়ালে দাদুর ছবিটা মনে পড়লো, যেটা গতকাল ভিতর থেকে বেরিয়েছে—যেন ঘড়িটা নিজেই তাকে দেখাতে চেয়েছে।
রান্নাঘরে গিয়ে সে চায়ের কাপ বানাতে শুরু করলো। জল ফুটছে গ্যাসে, বুদবুদ উঠছে ধীরে ধীরে, আর পেছন থেকে টিকটিক শব্দটা আসছে, যেন সঙ্গ দিচ্ছে। রাহুল চায়ের পাতা ঢালতে গিয়ে হাত কাঁপলো একটু, গরম জল ছিটকে পড়লো কাউন্টারে। "ধুর, কী হচ্ছে এসব," সে বিরক্ত হয়ে বললো নিজেকে। চা নিয়ে টেবিলে বসলো, খবরের কাগজ খুললো, কিন্তু চোখটা বারবার ঘড়িটার দিকে যাচ্ছে। পেন্ডুলামটা দুলছে, সোনালি রঙের ধাতু চকচক করছে আলোয়, কিন্তু তার মনে হলো যেন ডায়ালের পেছনে কোনো ছায়া নড়ছে, খুব অস্পষ্ট। সে চোখ বুজে মাথা ঝাঁকালো, "ঘুম কম হয়েছে, তাই ভুলভাল দেখছি।" কিন্তু যখন চোখ খুললো, শব্দটা যেন কাছে এসেছে, টিক... টিক... যেন তার কানের পাশে কেউ ফিসফিস করছে, অস্পষ্ট কথা। রাহুলের গায়ে কাঁটা দিলো, সে উঠে দাঁড়ালো, ঘড়িটা খুলে চাবি ঘুরিয়ে থামানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু চাবিটা ঘুরছে না, যেন আটকে গেছে। "কী ব্যাপার?" সে জোর করে ঘুরাতে গেল, কিন্তু হঠাৎ শব্দটা জোরালো হলো, টিকটিকটিক... যেন রাগ করে উঠেছে। রাহুল হাত সরিয়ে নিলো, তার হৃদয়ের ধুকধুক শোনা যাচ্ছে।
অফিস যাওয়ার সময় হলো। সে জামা পরে, ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লো, কিন্তু দরজা লক করার সময় পেছনে তাকালো—ঘড়িটা চলছে, শব্দটা ঘর ভর্তি করে রেখেছে। রাস্তায় অটো ধরে বসলো, জানালা দিয়ে বাইরের ভিড় দেখছে, কিন্তু তার মনে শুধু টিকটিক। অফিসে পৌঁছে সুমনকে দেখলো, যে তার ডেস্কে বসে কম্পিউটারে কাজ করছে। "কী রে, আজ তোর মুখটা ফ্যাকাসে লাগছে। রাতে আবার ঘড়ির শব্দে ঘুম হয়নি?" সুমন জিজ্ঞেস করলো, চোখ তুলে তাকিয়ে। রাহুল বসে পড়লো, "হ্যাঁ রে, শব্দটা যেন মাথায় ঢুকে গেছে। গতকাল রাতে মনে হলো ফিসফিসের মতো। আর আজ সকালে থামাতে গিয়ে চাবি আটকে গেল।" সুমন চেয়ার ঘুরিয়ে বললো, "দেখ, আমি বলেছিলাম না? পুরনো জিনিসে কখনও অদ্ভুত কিছু লেগে থাকে। তোর দাদুর ঘড়ি, হয়তো তার স্মৃতি বা কিছু... তুই একটা মেকানিকের কাছে নিয়ে যা।" রাহুল মাথা নাড়লো, "হয়তো। কিন্তু ছবিটা দেখেছিস? ভিতরে দাদুর পুরনো ছবি ছিল। যেন হঠাৎ বেরিয়ে এলো।" সুমন চোখ কুঁচকে বললো, "ছবি? অদ্ভুত তো। তুই সিরিয়াসলি চেক কর। আমার মামার ঘড়িটা একবার রাতে থেমে গিয়ে সকালে নিজে চালু হয়ে গিয়েছিল। পরে জানা গেল, ওটা তার দাদুর মৃত্যুর সময় থেমেছিল।" রাহুলের গায়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল, কিন্তু সে হাসার চেষ্টা করলো, "তুই তো সবসময় ভূতের গল্প বলিস। এটা নিশ্চয় মেকানিক্যাল ফল্ট।"
দুপুরে লাঞ্চের সময় রাহুলের মন অন্যদিকে। সে ক্যান্টিনে বসে খাবার খাচ্ছে, কিন্তু প্রতিটা চামচ তুলতে গিয়ে মনে হচ্ছে যেন টিকটিক শব্দটা তার মাথায় বাজছে, দূর থেকে। তার পাশে বসা আরেক কলিগ, মিতা, জিজ্ঞেস করলো, "রাহুল, তুমি ঠিক আছো? আজ কোনো কথা বলছ না।" রাহুল চমকে উঠলো, "হ্যাঁ, ঠিক আছি। শুধু একটা পুরনো ঘড়ির শব্দে সমস্যা হচ্ছে। রাতে ঘুম আসছে না।" মিতা হাসলো, "ঘড়ি? তাহলে থামিয়ে দাও। আমার বাড়িতে একটা ছিল, রাতে শুনলে মনে হতো কেউ হাঁটছে। পরে ফেলে দিয়েছি।" রাহুলের মনে হলো, হাঁটার শব্দ—ঠিক যেমন গত রাতে লেগেছে। সে তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে ডেস্কে ফিরলো, কিন্তু কাজে মন বসছে না। কম্পিউটারের স্ক্রিনে টাইপ করতে গিয়ে তার আঙুল কাঁপছে, আর মনে পড়ছে ঘড়িটার পেন্ডুলাম, দুলছে অন্ধকারে।
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে আসার সময় রাস্তায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে, হালকা ঝিরঝির, যেন আকাশটা কাঁদছে। রাহুল অটো থেকে নেমে ছাতা খুললো, তার ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে, পায়ের শব্দ তার নিজের কানে অদ্ভুত লাগছে—টিক... টিক... যেন ঘড়িটার সাথে মিলে যাচ্ছে। দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই শব্দটা আঘাত করলো, জোরালো, ঘরের প্রতিটা কোণায় প্রতিধ্বনিত। টিক... টিক... এখন যেন আরও ধীর, যেন কোনো অদৃশ্য পা টেনে টেনে হাঁটছে। রাহুল আলো জ্বালালো, ঘড়িটা দেখলো—পেন্ডুলাম দুলছে, কিন্তু ডায়ালের কাঁটা যেন এক জায়গায় আটকে আছে, সময় থেমে গেছে। "কী হয়েছে এটায়?" সে কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দেখলো, কাঠের ফ্রেমটা ঠান্ডা, হিমশীতল, যেন ফ্রিজ থেকে বের করা। সে চাবি ঘুরাতে চেষ্টা করলো, কিন্তু আবার আটকে। হঠাৎ শব্দটা পরিবর্তন হলো, টিক... টাক... যেন কোনো ভাঙা হাড়ের শব্দ। রাহুলের হাত সরে গেল, তার পিঠ বেয়ে ঘাম বইছে, যদিও ঘরটা ঠান্ডা।
সে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার বানাতে শুরু করলো, কিন্তু প্রতিটা ছুরির আওয়াজ, প্রতিটা পাতিলের ঠোকাঠুকি যেন টিকটিকের সাথে মিশে যাচ্ছে। খেতে বসে সে টিভি চালালো, ভলিউম বাড়িয়ে দিলো, কিন্তু শব্দটা পেরিয়ে আসছে, যেন টিভির পেছনে লুকিয়ে আছে। "এটা পাগলামি," সে বললো উচ্চস্বরে, যেন নিজেকে শোনাতে। কিন্তু যখন টিভি বন্ধ করলো, ঘর অন্ধকার হয়ে গেল, শুধু টিকটিক। রাহুল বিছানায় শুয়ে পড়লো, চোখ বুজলো, কিন্তু শব্দটা তার মাথায় ঢুকছে, ধীরে ধীরে। মনে হলো যেন কেউ ঘরে হাঁটছে, পায়ের শব্দ—টিক... টিক... কাছে আসছে। সে চোখ খুলে তাকালো, ঘর খালি, কিন্তু জানালার পর্দাটা একটু নড়লো, যেন হাওয়া নেই তবু। "কে?" সে চাপা গলায় বললো, কিন্তু উত্তর নেই, শুধু টিকটিক। তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলো, একটা অদৃশ্য হাত যেন তার ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে, ঠান্ডা আঙুল।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙলো, শব্দটা এখন তার কানের পাশে, টিক... টিক... যেন কেউ ফিসফিস করছে, "রাহুল... রাহুল..." সে লাফিয়ে উঠে বসলো, আলো জ্বালালো—ঘর খালি, কিন্তু ঘড়িটার ডায়ালে যেন একটা ছায়া পড়েছে, দাদুর মুখের মতো। "এটা কী?" সে উঠে কাছে গেল, ছায়াটা মিলিয়ে গেল, কিন্তু শব্দটা জোরালো হলো। রাহুলের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, তার মনে হলো যেন ঘরটা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, দেওয়ালগুলো কাছে এসে চাপ দিচ্ছে। সে ফোন তুলে সুমনকে কল করলো, রাত দুটো বাজে। "হ্যালো, সুমন? শোন, ঘড়িটা... শব্দটা যেন কথা বলছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।" সুমনের ঘুমজড়ানো গলা, "রাহুল? এত রাতে? তুই থামা ঘড়িটা। কাল সকালে আসব, দেখব।" কল কেটে গেল, কিন্তু শব্দটা চলছে, আরও কাছে, যেন তার বুকের ভিতর থেকে আসছে। রাহুল বিছানায় বসে রইলো, চোখ বুজতে ভয় লাগছে, কারণ অন্ধকারে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, দাদুর মতো, হাত বাড়িয়ে।
সকাল হলো, কিন্তু আলোটা আজ যেন ফিকে। রাহুল উঠে দাঁড়ালো, তার শরীর অবশ, চোখ লাল। ঘড়িটা চলছে, শব্দটা এখন স্বাভাবিক, কিন্তু তার মনে একটা গভীর অস্বস্তি, যেন কিছু একটা আসছে, ধীরে ধীরে। সে অফিসে গেল, কিন্তু কাজ করতে পারছে না, প্রতিটা মিনিট যেন টিকটিকের সাথে কাটছে। সুমন এসে বললো, "চল, আজ তোর ফ্ল্যাটে যাই। ঘড়িটা দেখি।" রাহুল মাথা নাড়লো, "হ্যাঁ, প্লিজ।" সন্ধ্যায় তারা দুজন ফিরলো, দরজা খুলে ঢুকতেই শব্দটা শোনা গেল, টিক... টিক... সুমন ঘড়িটা দেখে বললো, "সাধারণ লাগছে তো। চাবি ঘুরিয়ে দেখি।" সে চাবি ঘুরালো, কিন্তু আটকে গেল। "অদ্ভুত।" হঠাৎ শব্দটা পরিবর্তন হলো, টিক... টাক... যেন হাসির শব্দ। সুমনের মুখ ফ্যাকাসে, "এটা কী? মনে হচ্ছে যেন..." রাহুল বললো, "ফিসফিস। রাতে শুনিসনি?" তারা দুজন তাকিয়ে রইলো, ঘরটা যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে, আর শব্দটা বাড়ছে, যেন কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি জাগছে, ধীরে ধীরে। রাত নামলো, কিন্তু ভয়টা এখন দুজনের মনে, আর ঘড়িটা চলছে, তার রহস্য নিয়ে।
রাতটা যেন কখনও শেষ হচ্ছে না, ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো ঢুকছে, কিন্তু সেটা যেন ছায়া বাড়িয়ে দিচ্ছে পরিবর্তে আলো দেওয়ার। রাহুল আর সুমন দুজনেই টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে, যেন সেটা কোনো জীবন্ত প্রাণী যা তাদের দেখছে। শব্দটা এখন আবার স্বাভাবিক হয়েছে, টিক... টিক... কিন্তু প্রতিটা টিক যেন তাদের হৃদয়ের ধুকধুকের সাথে মিলে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে। সুমনের মুখ ফ্যাকাসে, তার হাতটা এখনও ঘড়ির চাবির কাছে, কিন্তু সে সরিয়ে নিয়েছে, যেন ছুঁয়ে ফেললে কিছু একটা ঘটবে। "এটা... এটা সত্যি অদ্ভুত, রাহুল। মনে হচ্ছে যেন ঘড়িটা নিজের মতো চলছে। চল, আমরা বাইরে গিয়ে কথা বলি।" সুমন বললো, তার গলা একটু কাঁপছে, কিন্তু সে চেষ্টা করছে শান্ত থাকার। রাহুল মাথা নাড়লো, "না, থাক। তুই যা, আমি দেখছি। হয়তো আমার মনের ভুল।" কিন্তু তার চোখটা ঘড়ির ডায়ালে আটকে আছে, সোনালি কাঁটাগুলো যেন ধীরে ধীরে ঘুরছে, কিন্তু সময়টা এখনও থেমে, যেন ঘড়িটা নিজের একটা জগতে আছে। সুমন দরজার দিকে এগোলো, "ঠিক আছে, কাল সকালে আসব। তুই ঘুমা, আর ওটাকে ছুঁয়ো না।" দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শোনা গেল, কিন্তু রাহুলের কানে শুধু টিকটিক।
সে চেয়ারে বসে পড়লো, হাত দিয়ে মুখ ঢাকলো। ঘরটা যেন আরও ছোট হয়ে আসছে, দেওয়ালগুলো কাছে এসে চাপ দিচ্ছে, আর বাইরে বৃষ্টির শব্দ মিশে যাচ্ছে ঘড়ির শব্দের সাথে—টিক... পট... টিক... পট... যেন কোনো ভিজে পায়ের ছাপ পড়ছে মেঝেতে। রাহুলের মনে পড়লো দাদুর কথা, যেমন ছোটবেলায় দাদু বলতেন, "এই ঘড়ি আমার সাথে অনেক রহস্য রাখে, বাবু। রাতে শুনলে মনে হয় কেউ ফিরে আসছে।" তখন সেটা গল্প মনে হতো, কিন্তু এখন? সে উঠে দাঁড়ালো, রান্নাঘরে গিয়ে এক গ্লাস জল খেলো, কিন্তু জলটা গিলতে গিয়ে তার গলায় আটকে গেল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত চেপে ধরেছে। "এটা আমার মন," সে বললো আয়নায় নিজের মুখ দেখে, চোখ লাল, চুল উসকো। কিন্তু আয়নার পেছনে যেন একটা ছায়া নড়লো, খুব অস্পষ্ট, দাদুর মতো। সে ঘুরে তাকালো—কিছু নেই। শব্দটা চলছে, ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে উঠছে, যেন কোনো পুরনো স্মৃতি জাগছে।
রাত বাড়ছে, ঘড়ির কাঁটা এখনও থেমে, কিন্তু পেন্ডুলাম দুলছে অবিরাম। রাহুল বিছানায় শুয়ে পড়লো, লাইটটা জ্বালিয়ে রাখলো, কিন্তু আলোটা যেন ফিকে হয়ে আসছে, যেন ঘড়িটা সব আলো শুষে নিচ্ছে। তার চোখ বুজতে চাইছে না, কারণ প্রতিবার বুজলে মনে হয় কেউ দাঁড়িয়ে আছে বিছানার পাশে, ঠান্ডা নিঃশ্বাস ফেলছে তার মুখে। টিক... টিক... এখন যেন কথা হয়ে উঠেছে, "রা... হুল... রা... হুল..." ফিসফিস, খুব কাছে। সে লাফিয়ে উঠে বসলো, ঘামে ভিজে গেছে শার্টটা, হাত-পা অবশ। "কে? কে আছো?" সে চিৎকার করে বললো, কিন্তু ঘর খালি, শুধু ঘড়িটা। সে উঠে কাছে গেল, ঘড়ির ফ্রেম ছুঁয়ে দেখলো—ঠান্ডা, হিমশীতল, যেন মৃতদেহের মতো। ভিতরে দাদুর ছবিটা এখনও আছে, কিন্তু ছবির মুখটা যেন হাসছে, আগে যা ছিল না। "দাদু? এটা তুমি?" রাহুলের গলা কাঁপছে, সে ছবিটা তুলে নিলো, কিন্তু হঠাৎ ঘড়ির শব্দটা পরিবর্তন হলো, টিকটাকটিকটাক... যেন দৌড়াচ্ছে কেউ, পায়ের শব্দ। রাহুলের পিঠ বেয়ে ঘাম বইছে, তার মনে হলো যেন ঘরের কোণ থেকে কোনো ছায়া উঠে আসছে, ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে।
সে ফোন তুলে নিলো, মাকে কল করলো, রাত তিনটে। "মা, দাদুর ঘড়ি... এটা অদ্ভুত করছে। শব্দটা যেন কথা বলছে।" মায়ের গলা ঘুমজড়ানো, "কী বলছিস বাবু? ওটা তো পুরনো জিনিস। দাদু বলতেন, ওতে তার জীবনের স্মৃতি আছে। তুই থামিয়ে দে। কিন্তু সাবধান, দাদু মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ঘড়িটা থামলে কিছু একটা ফিরে আসবে।" কল কেটে গেল, কিন্তু রাহুলের মনে একটা গভীর ভয় জাগলো। "ফিরে আসবে?" সে মনে মনে বললো, আর ঘড়িটার দিকে তাকালো। পেন্ডুলামটা এখন দুলছে জোরে, যেন রাগ করে উঠেছে, আর ডায়ালের পেছনে যেন একটা মুখ ফুটে উঠছে, দাদুর, কিন্তু চোখটা লাল, হাসি বাঁকা। রাহুল পিছিয়ে গেল, তার পায়ের তলায় মেঝেটা যেন কাঁপছে, খুব হালকা। "এটা না, এটা না," সে বললো, কিন্তু শব্দটা এখন তার মাথায়, "আমি... ফিরে... এসেছি... রাহুল..." ফিসফিস, স্পষ্ট। তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলো, একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল ঘরে, জানালা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও।
সে দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করলো, কিন্তু দরজাটা আটকে, যেন কেউ ধরে রেখেছে। "খোল! খোল!" সে চিৎকার করলো, কিন্তু বাইরে কোনো শব্দ নেই, শুধু টিকটিক। ঘুরে তাকালো—ঘড়িটা এখন টেবিল থেকে নেমে আসছে না, কিন্তু ছায়াটা বড় হয়েছে, দাদুর আকার, হাত বাড়িয়ে। "তুমি... তুমি কেন?" রাহুলের গলা ভেঙে আসছে, সে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লো। মনে পড়লো দাদুর মৃত্যুর কথা—গ্রামে, রাতে, ঘড়িটা থেমে গিয়েছিল ঠিক তার মৃত্যুর সময়। মা বলেছিলেন, দাদু নাকি বলেছিলেন, "আমার আত্মা এতে থাকবে, যতদিন চলে।" কিন্তু এখন? ঘড়িটা চলছে, কিন্তু সময় থেমে, যেন দাদুর আত্মা ফিরে এসেছে, রাহুলের মধ্যে ঢোকার জন্য। ছায়াটা কাছে আসছে, ঠান্ডা আঙুল তার ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে, "তোর মধ্যে... আমি থাকব... চিরকাল..." ফিসফিসটা এখন তার মাথায়, যেন তার নিজের চিন্তা হয়ে উঠেছে। রাহুলের চোখ বড় হয়ে উঠলো, তার মনটা যেন বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, একটা অন্ধকার অংশ জাগছে, দাদুর মতো—রাগ, দুঃখ, অজানা রহস্য। সে চিৎকার করতে চাইলো, কিন্তু গলা থেকে শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু টিক... টিক... তার বুকের ভিতর থেকে।
সকালের আলো ঢুকলো, কিন্তু ঘরটা এখনও অন্ধকার। সুমন দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকলো, চাবি দিয়ে খুলে। "রাহুল? রাহুল!" সে চিৎকার করলো, কিন্তু রাহুল টেবিলে বসে আছে, ঘড়িটা হাতে নিয়ে, চোখ ফাঁকা। ঘড়িটা চলছে, টিক... টিক... কিন্তু রাহুলের মুখে একটা বাঁকা হাসি, দাদুর মতো। "সুমন... এটা ভালো লাগছে। শব্দটা... এখন আমার মধ্যে।" তার গলা যেন দাদুর, গভীর, অন্ধকার। সুমন পিছিয়ে গেল, তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো, কারণ রাহুলের চোখে যেন দাদুর ছায়া, আর ঘড়িটা থেমে গেছে অবশেষে, কিন্তু শব্দটা এখন রাহুলের নিঃশ্বাসে মিশে আছে, চিরকালের জন্য। ঘরটা ঠান্ডা, যেন কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি এখনও আছে, ফিসফিস করে বলছে, "আমি ফিরে এসেছি... তোদের সবার মধ্যে।" সুমন দৌড়ে বেরিয়ে গেল, কিন্তু তার মনে জানা আছে, ঘড়িটা শুধু শুরু, অন্ধকারটা ছড়িয়ে পড়বে, ধীরে ধীরে, প্রতিটা টিকটিকের সাথে।

0 Comments