লেখক :- শিহাব 



পুরান ঢাকার গলিঘুঁজিগুলো দিনের বেলাতেও কেমন যেন একটা স্যাঁতস্যাঁতে আর অন্ধকার ভাব ধরে রাখে। উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর কারণে সূর্যের আলো সহজে মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। এমনই এক গলির ভেতরে আমাদের বাসা। তিনতলা পুরনো বাড়িটার দোতলায় আমরা থাকি। আমি, আমার স্ত্রী রোকসানা আর আমাদের সাত বছরের ছেলে রিফাত। আমি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করি, তাই সকাল হলেই অফিসের জন্য দৌড়াতে হয়। রোকসানা ঘর সামলায় আর রিফাতকে নিয়ে তার দিন কাটে। আমাদের জীবনটা আর দশটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই শান্ত আর ছিমছাম চলছিল। কিন্তু সেই শান্তি বেশিদিন স্থায়ী হলো না।


ঘটনার শুরুটা হয়েছিল খুবই সাধারণ একটা বিষয় দিয়ে। একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি রোকসানার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। আমি জুতো খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে? তোমার শরীর খারাপ লাগছে?"


রোকসানা ইতস্তত করে বলল, "না, শরীর ঠিক আছে। কিন্তু আজ দুপুরে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।"


আমি সোফায় বসতে বসতে বললাম, "কী ঘটনা?"


"দুপুরে রিফাত ঘুমিয়েছিল," রোকসানা বলতে শুরু করল, "আমি রান্নাঘরে কাজ করছিলাম। হঠাৎ শোবার ঘর থেকে কেমন যেন একটা ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো রিফাত ঘুমের ঘোরে কথা বলছে। কিন্তু আওয়াজটা ঠিক বাচ্চার মতো ছিল না। কেমন যেন ভারী, বয়স্ক কোনো পুরুষের গলার স্বর।"


আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম। "কী বলছ এসব? আশেপাশে তো কেউ ছিল না। হয়তো অন্য কোনো ফ্ল্যাট থেকে আওয়াজ এসেছে।"


"না," রোকসানা জোর দিয়ে বলল, "আওয়াজটা একদম আমাদের শোবার ঘর থেকেই আসছিল। আমি ভয়ে ভয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেতর থেকে স্পষ্ট শুনলাম, কেউ একজন খুব নিচু স্বরে কথা বলছে। কিন্তু কী বলছে, তা বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল যেন কোনো দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে।"


আমি একটু অবাক হলাম, কিন্তু বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না। বললাম, "হয়তো তোমার শোনার ভুল। পুরনো বাড়ি, কত রকম আওয়াজ হয়। চিন্তা কোরো না।"


রোকসানা আর কিছু বলল না, কিন্তু তার চোখের ভয়টা আমার নজর এড়াল না। আমি ভাবলাম, হয়তো একা একা থাকতে থাকতে ওর মাথায় এসব চিন্তা ঢুকছে।


কিন্তু কয়েকদিন পর আমিও সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। সেদিন ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়ে এসে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর আমি আর রিফাত শোবার ঘরে বসে খেলছিলাম। রোকসানা রান্নাঘরে বিকালের নাস্তা বানাচ্ছিল। হঠাৎ করেই ঘরের ভেতরটা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আশ্বিন মাসের গরমেও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। রিফাত খেলা থামিয়ে আমার দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়।


"বাবা, ওই কোণায় কে দাঁড়িয়ে আছে?" রিফাত আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।


আমি চমকে উঠে ঘরের কোণার দিকে তাকালাম। সেখানে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিন্তু আমার মনে হলো, আবছা ছায়ার মতো কিছু একটা যেন দাঁড়িয়ে আছে। একটা লম্বা, কালো অবয়ব। আমি ভালো করে দেখার জন্য চোখ পিটপিট করলাম, কিন্তু ততক্ষণে ছায়াটা মিলিয়ে গেছে। ঘরের তাপমাত্রাও আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।


আমি রিফাতকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, "কই বাবা, ওখানে তো কিছু নেই। তোমার চোখের ভুল।"


কিন্তু আমার নিজের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, এটা শুধু চোখের ভুল নয়। কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটছে আমাদের এই বাসায়।


সেদিন রাতে খাওয়ার পর আমরা সবাই মিলে বসার ঘরে টিভি দেখছিলাম। হঠাৎ করেই শোবার ঘর থেকে ঝনঝন করে কিছু একটা ভেঙে পড়ার শব্দ হলো। আমরা তিনজনই চমকে উঠলাম। আমি দৌড়ে শোবার ঘরে গেলাম। রোকসানা আর রিফাত ভয়ে আমার পেছনে এসে দাঁড়াল।


ঘরে ঢুকে দেখি, ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা আমার পারফিউমের বোতলটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, ড্রেসিং টেবিলটা ঘরের একপাশে, আর বোতলটা পড়েছে ঘরের ঠিক মাঝখানে। এত দূরে ছিটকে পড়ার কোনো কারণই নেই। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন সজোরে ওটাকে তুলে আছাড় মেরেছে।


রোকসানা ভয়ে আমার হাত চেপে ধরল। "আমি বলেছিলাম না, এই বাসায় কিছু একটা আছে! আমার কথা তো তুমি বিশ্বাসই করছিলে না।"


আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছিল না। ঘরের বাতাসে একটা তীব্র মিষ্টি গন্ধ ভাসছিল, যেন কেউ এক বোতল আতর ঢেলে দিয়েছে। অথচ ভেঙেছে আমার পারফিউমের বোতল। রিফাত ভয়ে কাঁদতে শুরু করল। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার নিজেরই তখন গলা শুকিয়ে কাঠ।


সেই রাতটা ছিল আমাদের জন্য এক বিভীষিকা। আমরা তিনজনই বসার ঘরে সোফায় গুটিশুটি মেরে বসে রইলাম। কেউ ঘুমানোর সাহস পেলাম না। সারা রাত ধরে শোবার ঘর থেকে অদ্ভুত সব আওয়াজ আসতে লাগল। কখনো মনে হচ্ছিল কেউ ঘরের ভেতর দ্রুত পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে, কখনো দেয়ালে খামচি কাটার শব্দ, আবার কখনো সেই দুর্বোধ্য ভাষায় ফিসফিসানি। প্রত্যেকটা শব্দ আমাদের স্নায়ুর ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল। ভোরের আজান দেওয়ার পর ধীরে ধীরে সব শব্দ থেমে গেল। আমরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।


সকালে আমি ঠিক করলাম, এই বিষয়ে আর চুপ করে থাকা যাবে না। পাশের ফ্ল্যাটের আসলাম চাচার সাথে কথা বলতে হবে। তিনি এই বাড়িতে অনেকদিন ধরে আছেন, হয়তো তিনি কিছু জানতে পারেন।


সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে রাতের সেই জমাট বাঁধা ভয়টা কিছুটা হালকা হলেও মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। রোকসানার চোখ দুটো নির্ঘুম আর আতঙ্কে ফোলা ফোলা। রিফাতও কেমন যেন চুপসে গেছে, সারাক্ষণ আমার বা ওর মায়ের গা ঘেঁষে থাকছে। নাস্তা বানানোর সময়ও রোকসানা বারবার চমকে উঠছিল। রান্নাঘরের খুটখাট শব্দেও তার বুক কেঁপে উঠছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, এই ভয়টা মন থেকে সহজে যাওয়ার নয়। অফিসের জন্য তৈরি হতে গিয়েও মনটা খচখচ করছিল। ওদের দুজনকে এই অবস্থায় একা ফেলে রেখে যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু চাকরিটাও জরুরি।


অফিসে যাওয়ার আগে আমি আসলাম চাচার ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়লাম। আসলাম চাচা ষাটোর্ধ্ব একজন মানুষ, রিটায়ার্ড সরকারি কর্মকর্তা। এই বাড়িতে তিনি প্রায় পনেরো বছর ধরে আছেন। দরজা খুললেন চাচী। আমাকে দেখে একটু অবাক হয়ে বললেন, "কী বাবা, সকাল সকাল? সব ঠিক আছে তো?"


আমি শুকনো হেসে বললাম, "চাচা কি বাসায় আছেন? একটু কথা ছিল।"


চাচী আমাকে ভেতরে ড্রয়িং রুমে বসতে বললেন। একটু পর আসলাম চাচা লুঙ্গি আর ফতুয়া পরা অবস্থায় এসে আমার সামনে বসলেন। তার মুখে একটা শান্ত, সৌম্য ভাব।


"কী ব্যাপার, ইকবাল? কোনো সমস্যা?" তিনি চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।


আমি একটু ইতস্তত করে গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলো খুলে বললাম। ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ, ছায়ার মতো অবয়ব দেখা, পারফিউমের বোতল ভেঙে যাওয়া আর রাতের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা—সবকিছু। আমার কথা শোনার সময় আসলাম চাচার মুখের শান্ত ভাবটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।


সব শুনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমি কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। তোমাদের আগে এই ফ্ল্যাটে যে ভাড়াটিয়া ছিল, তারাও ছয় মাসের বেশি টিকতে পারেনি। কিছু না বলেই হঠাৎ করে একদিন বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল।"


আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। "কেন চাচা? কী হয়েছিল তাদের সাথে?"


"তারা ঠিক খুলে কিছু বলেনি," চাচা নিচু স্বরে বললেন, "শুধু যাওয়ার আগে বলেছিল, এই বাসায় নাকি ‘সমস্যা’ আছে। এর বেশি কিছু জানতে চাইলেও এড়িয়ে গিয়েছিল। বাড়ির মালিককে বলেও কোনো লাভ হয়নি। তিনি এসব বিশ্বাস করেন না, উল্টো তাদেরকেই পাগল বলেছিলেন।"


তিনি একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন, "এই বাড়িটা অনেক পুরনো। আমার বাবা বলতেন, এখানে একসময় এক ধনী বণিকের বাস ছিল। তার নাকি এক অপরূপা কন্যা ছিল। মেয়েটা কথা বলতে পারত না, বোবা ছিল। কিন্তু তার রূপের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। একদিন রাতে সেই মেয়ে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায়। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ বলে তাকে জ্বীনে তুলে নিয়ে গেছে, কেউ বলে তাকে হত্যা করে এই বাড়ির কোথাও পুঁতে রাখা হয়েছে। এরপর থেকেই নাকি এই বাড়িতে নানা রকম অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে।"


আসলাম চাচার কথাগুলো আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বইয়ে দিল। তাহলে কি আমরা একা নই? এই বাড়িতে কি সত্যিই অশরীরী কিছুর অস্তিত্ব আছে?


চাচা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, "ভয় পেয়ো না, বাবা। সাহস রাখো। আর শোনো, সন্ধ্যার পর ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেবে। আর রিফাতকে একা ঘরে রাখবে না। কোরআন তেলাওয়াত করবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। ইনশাআল্লাহ্‌, কোনো অমঙ্গল হবে না।"


আমি চাচাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। রোকসানাকে সব কথা খুলে বললাম। সব শুনে ও কান্নায় ভেঙে পড়ল। "আমি এখানে এক মুহূর্তও থাকব না! চলো, আমরা এই বাসা ছেড়ে দিই। আমার ছেলের যদি কিছু হয়ে যায়?"


আমি ওকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিলাম। "পাগলামি কোরো না, রোকসানা। এত সহজে কি বাসা বদলানো যায়? নতুন বাসা খোঁজা, অ্যাডভান্স দেওয়া—অনেক ঝামেলার ব্যাপার। আর তাছাড়া, এসব হয়তো পুরনো দিনের কুসংস্কার। আমরা সাহস রাখলে কিছুই হবে না।"


কিন্তু আমার নিজের মনই সায় দিচ্ছিল না। আসলাম চাচার কথাগুলো শোনার পর থেকে ভয়টা যেন আরও জাঁকিয়ে বসেছে।


সেদিন অফিস থেকে ফিরতে আমার একটু রাত হলো। গলির মুখে ঢুকতেই গা ছমছম করে উঠল। চারপাশটা কেমন অস্বাভাবিক রকমের নিস্তব্ধ। রাস্তার কুকুরগুলোও আজ ডাকছে না। আমাদের বাড়ির সামনে এসে দোতলার বারান্দার দিকে চোখ পড়তেই আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। বারান্দার গ্রিল ধরে আবছা অবয়বে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। স্পষ্ট বোঝা না গেলেও আমার মনে হলো, কোনো এক নারীমূর্তি বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি চোখ কচলে আবার তাকালাম। কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। বারান্দাটা একদম ফাঁকা। আমার শরীর বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম।


দরজা খুলল রোকসানা। তার মুখটা ফ্যাকাসে। আমাকে দেখেই প্রায় কেঁদে ফেলার মতো করে বলল, "তাড়াতাড়ি ভেতরে এসো। রিফাত খুব ভয় পেয়েছে।"


আমি ঘরে ঢুকে দেখি রিফাত সোফার এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার চোখ দুটো ভয়ে বিস্ফারিত। আমি ওর পাশে বসে মাথায় হাত রাখতেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।


"কী হয়েছে, বাবা? কী হয়েছে?" আমি焦急ভাবে জিজ্ঞেস করলাম।


রোকসানা কান্না জড়ানো গলায় বলল, "আমি মাগরিবের নামাজ পড়ছিলাম। রিফাত বসার ঘরে খেলছিল। হঠাৎ ও ‘মা, মা’ বলে চিৎকার করে আমার কাছে দৌড়ে আসে। এসে বলে, বারান্দায় নাকি একটা ‘লম্বা চুলের আন্টি’ দাঁড়িয়ে ছিল। আন্টিটা নাকি ওর দিকে তাকিয়ে হাসছিল, কিন্তু সেই হাসিটা খুব ভয়ঙ্কর ছিল।"


রোকসানার কথা শুনে আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, আমি নিচে থেকে যা দেখেছি, তা কোনো বিভ্রম ছিল না। সেই ছায়ামূর্তিটা সত্যিই ছিল। আর সেটা আমার ছেলের সামনেও এসেছিল। আমার সমস্ত শরীর রাগে আর আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। আমার ছেলের ক্ষতি করার চেষ্টা?


সেদিন রাতে আমরা কেউই ঘুমাতে পারলাম না। তিনজনই বসার ঘরে আলো জ্বালিয়ে বসে রইলাম। রাত যত গভীর হতে লাগল, বাড়ির ভেতর অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড বাড়তে লাগল। রান্নাঘর থেকে বাসনপত্র ঝনঝন করে পড়ে যাওয়ার শব্দ আসতে লাগল। আমরা ভয়ে সেদিকে যাওয়ার সাহস পেলাম না। শোবার ঘরের দরজাটা হঠাৎ করে সজোরে বন্ধ হয়ে গেল, আবার কিছুক্ষণ পর নিজেই খুলে গেল। মনে হচ্ছিল, কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন আমাদের ভয় দেখিয়ে মজা পাচ্ছে।


রাত প্রায় দুটো বাজে। হঠাৎ করে পুরো বাড়িটা থরথর করে কেঁপে উঠল, যেন মৃদু ভূমিকম্প হচ্ছে। আমরা ভয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। ঠিক তখনই বসার ঘরের ঠিক মাঝখানে, আমাদের থেকে হাত দশেক দূরে, একটা আবছা ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সেই ধোঁয়া একটা মানব অবয়ব নিতে লাগল। একটা লম্বা, শীর্ণকায় নারীমূর্তি। তার চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। মুখটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু অন্ধকারের চেয়েও গভীর দুটো চোখ যেন আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তার শরীর থেকে সেই তীব্র মিষ্টি আতরের গন্ধটা আবার ভেসে এলো, যা আগের রাতে পারফিউমের বোতল ভাঙার পর পেয়েছিলাম।


রিফাত ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে আমার কোলে ঢলে পড়ল। রোকসানা চিৎকার করে কোরআনের আয়াত পড়া শুরু করল। সেই মূর্তিটা ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এক পা এগিয়ে এলো। তার কোনো পা দেখা যাচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল যেন সে বাতাসে ভেসে ভেসে আসছে। তার এগিয়ে আসার সাথে সাথে ঘরের তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করল। আমাদের নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এলো, ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার জোগাড়।


আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি শুধু আমার জ্ঞান হারানো ছেলেকে বুকে চেপে ধরে বসেছিলাম। সেই ছায়ামূর্তিটা যখন আমাদের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে, ঠিক তখনই ফজরের আজানের প্রথম ধ্বনি "আল্লাহু আকবার" ভেসে এলো কাছের মসজিদ থেকে।


আজানের ধ্বনি কানে পৌঁছানো মাত্রই সেই মূর্তিটা যেন তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। একটা বিকট, অমানুষিক আর্তনাদ করে উঠল সে, যা আমাদের কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার উপক্রম। তারপর চোখের পলকে ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। রেখে গেল শুধু সেই তীব্র মিষ্টি গন্ধ আর আমাদের তিনজনের জমে যাওয়া আতঙ্ক।


ফজরের আজানের ধ্বনি বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার পরেও আমরা তিনজন পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে বসে রইলাম। ঘরের তীব্র মিষ্টি গন্ধটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে, কিন্তু আমাদের মনের ভেতর যে আতঙ্কের গন্ধ গেঁথে গেছে, তা বোধহয় কোনোদিনও যাবে না। রিফাত তখনও আমার কোলে অচেতন। তার ছোট্ট শরীরটা বরফের মতো ঠাণ্ডা। রোকসানা ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোরআনের আয়াত পড়েই চলেছে, যেন থামলেই সেই ভয়ঙ্কর মূর্তিটা আবার ফিরে আসবে। আমার নিজের ভেতরটা একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ভয়, রাগ, অসহায়ত্ব—সব অনুভূতি যেন একসাথে জমাট বেঁধে গেছে। আমি আর ভাবতে পারছিলাম না। শুধু বুঝতে পারছিলাম, এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয়। এটা আর শুধু ভয় দেখানো বা অস্তিত্ব জানান দেওয়ার পর্যায়ে নেই। এটা এখন সরাসরি আক্রমণের সামিল।


ভোরের আলো যখন জানালা দিয়ে উঁকি দিতে শুরু করল, আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। আমার পা দুটো কাঁপছিল। রিফাতকে সাবধানে সোফায় শুইয়ে দিয়ে রোকসানার কাঁধে হাত রাখলাম। ও চমকে আমার দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, দৃষ্টি শূন্য।


আমি ভাঙা গলায় বললাম, "ওঠো, রোকসানা। গোছগাছ শুরু করো।"


রোকসানা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। "কোথায় যাব?"


"যেখানে হোক," আমার গলার স্বরটা নিজের কাছেই অচেনা শোনাল। "এই জাহান্নামে আর এক মুহূর্তও নয়। আজই আমরা এই বাসা ছাড়ব। দরকার হলে রাস্তায় থাকব, তবু এখানে নয়।"


আমার কথার মধ্যে হয়তো এমন কিছু ছিল, যা রোকসানাকে শক্তি দিল। সে молча উঠে দাঁড়াল। আমরা দুজন কোনো কথা না বলে শোবার ঘরে ঢুকলাম। ঘরের ভেতরটা লন্ডভন্ড। আলমারির দরজা খোলা, কাপড়চোপড় সব মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো। যেন কোনো ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে ঘরের ভেতর দিয়ে। আমরা কোনোদিকে না তাকিয়ে শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র—কিছু কাপড়, রিফাতের বই, জরুরি কাগজপত্র—দুটো স্যুটকেসে ভরতে শুরু করলাম। আমাদের প্রতিটি নড়াচড়া ছিল যান্ত্রিক। মনে হচ্ছিল, আমরা দুটো রোবট, যাদের কোনো অনুভূতি নেই।


সকাল আটটা নাগাদ রিফাতের জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলেই ও "ওই আন্টিটা" বলে ভয়ে চিৎকার করে উঠল। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, "কিছু হয়নি বাবা, আমরা চলে যাচ্ছি। আর কোনো ভয় নেই।" কিন্তু আমার নিজের গলাতেই কোনো ভরসা ছিল না।


আমি বাড়ির মালিককে ফোন দিলাম। লোকটা আমার কথা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাইল না। উল্টো আমাকেই দোষারোপ করতে লাগল।


"কীসব আজেবাজে কথা বলছেন, ইকবাল সাহেব? বাসা ছাড়তে চাইলে এক মাসের নোটিশের নিয়ম। এখন বললে তো আমি অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত দিতে পারব না।"


আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। আমি চিৎকার করে বললাম, "আপনার টাকার নিকুচি করি! আমি আমার পরিবার নিয়ে এক মুহূর্তও আপনার অভিশপ্ত বাড়িতে থাকব না। আপনার যা করার আছে, করেন!"


ফোনটা কেটে দিয়ে আমি আসলাম চাচার কাছে গেলাম। তাকে সংক্ষেপে রাতের ঘটনা বললাম। সব শুনে তার মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। তিনি কোনো কথা না বলে শুধু বললেন, "তোমরা ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছ, বাবা। আমি একটা ব্যবস্থা করছি।"


তিনি তার এক পরিচিত লোকের সাথে কথা বলে কাছেই একটা ছোট বাসা কয়েকদিনের জন্য ঠিক করে দিলেন। বললেন, "তোমরা আপাতত ওখানে ওঠো। তারপর ধীরে সুস্থে নতুন বাসা খুঁজে নিও।" এই বিপদের দিনে মানুষটার সাহায্য পেয়ে আমার চোখে পানি এসে গেল।


দুপুরের আগেই একটা ভ্যানগাড়ি জোগাড় করে আমরা মালপত্র নামাতে শুরু করলাম। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি ওপর থেকে কিছু একটা ঝাঁপিয়ে পড়বে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনে হচ্ছিল, পেছন থেকে কেউ যেন আমাদের ঘাড়ে শীতল নিঃশ্বাস ফেলছে। আমি বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলাম, কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধু সেই মিষ্টি গন্ধটা যেন বাড়ির প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি ইটের ভাজে মিশে আছে।


সব মালপত্র ভ্যানে তুলে আমরা যখন বাড়ির গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছি, আমি শেষবারের মতো দোতলার বারান্দাটার দিকে তাকালাম। আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। বারান্দার গ্রিল ধরে সেই লম্বা চুলের নারীমূর্তিটা দাঁড়িয়ে আছে। এবার আর আবছা নয়, কিছুটা স্পষ্ট। তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না, চুল দিয়ে ঢাকা। কিন্তু আমি অনুভব করতে পারছিলাম, সে আমাদের চলে যাওয়া দেখছে। তার দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে কোনো আক্রোশ ছিল না, ছিল এক গভীর, শীতল উদাসীনতা। যেন আমাদের এই আসা-যাওয়া তার কাছে কোনো অর্থই বহন করে না। আমরা শুধু তার অনন্তকালের একঘেয়েমিতে ক্ষণিকের বিনোদন ছিলাম মাত্র।


নতুন বাসায় এসেও আমরা স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। রাতের পর রাত আমরা আলো জ্বালিয়ে ঘুমাতাম। সামান্য শব্দেও চমকে উঠতাম। রিফাত ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠত। তার হাসিখুশি মুখটা কেমন যেন ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিল। সে আর একা একা খেলতে চাইত না, একা বাথরুমেও যেত না। সারাক্ষণ আমাদের কাউকে আঁকড়ে ধরে রাখত।


আমরা একজন মনোচিকিৎসকের কাছে রিফাতকে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললেন, ও প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছে। সেরে উঠতে সময় লাগবে। রোকসানাও কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। আগের মতো হাসত না, কথা বলত না। মাঝে মাঝে দেখতাম, ও শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলে বলত, "কিছু না।" কিন্তু আমি জানতাম, সেই রাতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি ওকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।


আর আমি? আমি বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে যেতাম। অফিস করতাম, বাসা বদলের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতাম। কিন্তু রাতে যখন একা হতাম, সেই দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠত। সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী, সেই ভেসে আসা নারীমূর্তি, সেই অমানুষিক আর্তনাদ। আর সবচেয়ে বেশি করে মনে পড়ত শেষ দৃশ্যের কথা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মূর্তিটার শীতল উদাসীনতা।


কয়েক মাস কেটে গেছে। আমরা নতুন একটা অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছি। আধুনিক, খোলামেলা ফ্ল্যাট। এখানে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে না। রিফাতও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। রোকসানাও আবার আগের মতো হওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের জীবনটা আবার একটা ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছে।


কিন্তু কিছু ক্ষত বোধহয় কখনোই শুকায় না।


মাঝে মাঝে গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমার মনে হয়, বাতাসে যেন একটা পরিচিত মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। আমি কান পেতে থাকি, এই বুঝি শুনব কোনো ফিসফিসানি। আমি জানি, এটা আমার মনের ভুল। সেই বাড়ি, সেই সত্তা—সব আমরা পেছনে ফেলে এসেছি।


কিন্তু সত্যিই কি ফেলে আসতে পেরেছি?


কখনো কখনো আমার মনে এক অদ্ভুত, শীতল প্রশ্ন জেগে ওঠে। সেই সত্তাটা কি সত্যিই শুধু ওই বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল? নাকি সে কোনো নির্দিষ্ট স্থানের নয়, বরং কোনো নির্দিষ্ট মানুষের ওপর ভর করে? সে কি আমাদের ভয় দেখিয়ে শুধু তাড়াতে চেয়েছিল, নাকি অন্য কিছু চেয়েছিল? আসলাম চাচা বলেছিলেন, বণিকের বোবা মেয়ের কথা। যাকে জ্বীনে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সেই মেয়েটিও তো একা ছিল।


আমার চোখ যায় রিফাতের দিকে। ও এখন আগের চেয়ে অনেক শান্ত। মাঝে মাঝে একা একা বসে ছবি আঁকে। সেদিন ওর আঁকার খাতাটা দেখতে গিয়ে আমি জমে গেলাম। খাতার একটা পাতা জুড়ে একটা ছবি। একটা লম্বা চুলের মেয়ের ছবি, যার মুখটা চুল দিয়ে ঢাকা। মেয়েটা একটা পুরনো বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আর ছবির এক কোণায় ছোট করে লেখা—"আমার বন্ধু"।


আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এলো। আমি রিফাতের দিকে তাকালাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু সেই হাসিটা আগের মতো সরল নয়। সেই হাসির গভীরে এমন কিছু একটা আছে, যা শীতল, যা অচেনা, যা আদিম।


তাহলে কি আমরা কিছুই পেছনে ফেলে আসিনি? আমরা কি সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পালিয়ে এসেছিলাম, নাকি সেই অভিশাপকেই নিজের অজান্তে সাথে করে নিয়ে এসেছি? সেই সত্তাটা কি রিফাতের একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে তার "বন্ধু" হয়ে গেছে? আমার ছেলে কি আর আগের মতো আছে, নাকি তার সরলতার আড়ালে অন্য কেউ ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছে?


এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। আমি শুধু জানি, আমাদের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়নি। হয়তো তা নতুন করে শুরু হয়েছে, আরও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর রূপে। আমরা এখন এক অন্তহীন আতঙ্কের গোলকধাঁধায় বন্দী, যেখানে আলো জ্বালিয়ে রাখলেও অন্ধকার পিছু ছাড়ে না। কারণ, সবচেয়ে বড় ভয়টা এখন আর বাইরের কোনো বাড়িতে নয়, আমাদের নিজেদের ঘরের ভেতরেই নিঃশব্দে বেড়ে উঠছে।