বাংলার এক প্রায়-বিস্মৃত প্রান্তরে, যেখানে সভ্যতার আলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে 'নিশাবাঁক জংশন'। নামটার মধ্যেই একটা গা ছমছমে ব্যাপার আছে—‘নিশা’ মানে রাত, আর ‘বাঁক’ মানে মোড়। যেন রাত হলেই সে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে এক অচেনা, ভয়াবহ জগতে নিয়ে যায়।
স্টেশনটা তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হিসেবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর, নতুন লাইন পাতা হলো অন্য পথে। নিশাবাঁক জংশন ধীরে ধীরে তার গুরুত্ব হারালো। প্ল্যাটফর্মের গা থেকে চুন-সুরকি খসে পড়েছে, টিনের ছাউনিগুলো মরচে ধরে ঝুলে আছে, আর পুরনো সিগন্যাল পোস্টগুলো যেন কঙ্কালের মতো আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। দিনের বেলা দু-একটা লোকাল ট্রেন থেমে যায় বটে, কিন্তু সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই স্টেশনটা যেন তার পরিত্যক্ত অতীতকে বুকে টেনে নেয়।
এই জনমানবহীনতার প্রধান কারণ একটিই—একটি লোককথা, যা বছরের পর বছর ধরে ওই অঞ্চলের মানুষের শিরায় শিরায় ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। গল্পটা হলো—'দশটার পরের ছায়া'।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, ঠিক রাত দশটা বাজার পর এই স্টেশনে এক ছায়ামূর্তি দেখা যায়। সেটা নাকি কোনও মানুষের ছায়া নয়, বরং অন্ধকারেরই এক বিকৃত রূপ। সে ছায়া প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়ায়, কখনও টিকেট কাউন্টারের ভাঙা জানালা দিয়ে উঁকি দেয়, আবার কখনও ওয়েটিং রুমের মরচে ধরা বেঞ্চগুলোর ওপর দিয়ে নিঃশব্দে ভেসে যায়। গ্রামের মানুষ শপথ করে বলে, সেই ছায়া নাকি মাঝে মাঝে এক করুণ, দীর্ঘশ্বাসযুক্ত হুইসেলের শব্দ করে, যেন কোনো হারিয়ে যাওয়া ট্রেনকে ডাকছে। এই ভয়ের কারণেই, রাত দশটার পরে নিশাবাঁকের দিকে কেউ ভুলেও পা বাড়ায় না। এমনকি শেষ ট্রেনের চালকও দ্রুত হুইসেল বাজিয়ে, যেন প্রাণপণে ছুটতে চায় সেই অভিশাপ থেকে দূরে।
আর্নবের অন্বেষণ
অর্ণব মুখার্জী, এক তরুণ, উৎসাহী এবং ঘোর সংশয়বাদী সাংবাদিক, এই লোককথাগুলো শুনে হাসতো। “সবই কুসংস্কার আর গ্ৰাম্য মানুষের মনের ভুল,” সে বলতো। কিন্তু পেশাগত কৌতূহল তাকে টেনে আনলো নিশাবাঁকে। সে ঠিক করলো, এই ভূতের গল্পের আড়ালের সত্যিটা সে খুঁজে বের করবে—যা সে বিশ্বাস করতো, তা হলো কোনো পুরনো চুরি বা ডাকাতির রহস্য।
অর্ণব একদিন সন্ধ্যার মুখে নিশাবাঁকে পৌঁছাল। তার উদ্দেশ্য ছিল শেষ ট্রেনের (যা প্রায় ৯:৩০ এ আসত) যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা, আর তারপর রাতটা সেখানেই কাটানো—ঠিক দশটার পরের অভিশাপ নিজের চোখে দেখার জন্য।
সেদিন ছিল পূর্ণিমা, কিন্তু মেঘে ঢাকা। আবহাওয়াটা ভারী আর থমথমে। স্টেশনের একমাত্র কর্মচারী, বৃদ্ধ গণেশ কাকা, অর্ণবকে দেখে যেন আঁতকে উঠলেন।
“বাবু, আপনি এখানে কী করছেন? আপনি কি জানেন না...” গণেশ কাকা ফিসফিস করে বললেন।
অর্ণব হেসে বলল, “জানি কাকা। দশটার পরে ছায়া আসে। আমি সেটাই দেখতে এসেছি। চিন্তা করবেন না, আমার কাছে একটা ভালো ক্যামেরা আছে, আর একটা টর্চ। ভয় পাই না।”
গণেশ কাকার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “বাবু, সাহস দেখাবেন না। ছায়া আপনার ক্যামেরায় ধরা দেবে না, কিন্তু আপনার সাহসটুকু কেড়ে নেবে। আমার কথা শুনুন, ৯:৩০-এর ট্রেনে ফিরে যান। স্টেশনের পেছনে একটা পুরনো কুয়ো আছে, ওর জল ছোঁবেন না। আর দশটার পরে প্ল্যাটফর্মের দিকে যাবেনই না।”
অর্ণব গণেশ কাকার কথা হালকাভাবে উড়িয়ে দিল। রাত ৯:১৫-এ শেষ ট্রেন এল। প্ল্যাটফর্ম প্রায় খালি, দু-একজন যাত্রী দ্রুত নেমে হনহন করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ৯:৩০-এর মধ্যে ট্রেন চলে গেল। ট্রেন চলে যাওয়ার পর যে নীরবতা নেমে এল, তা কোনো সাধারণ নীরবতা নয়—সেটা যেন অন্ধকারের একটা জমাট বাঁধা উপস্থিতি।
গণেশ কাকা দ্রুত তার ছোট ঘর বন্ধ করে তালা মেরে, অর্ণবের দিকে একটা আতঙ্কিত দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে স্টেশন ত্যাগ করলেন। যাওয়ার আগে শুধু বললেন, “ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন, বাবু।”
দশটা
অর্ণব প্ল্যাটফর্মের একমাত্র অক্ষত বেঞ্চটিতে তার ব্যাগ রাখল। হাতে তার নোটবুক আর ক্যামেরা। ঘড়িতে তখন ৯:৪০।
স্টেশন ঘরটির ভিতরে তখন অন্ধকার আর ধুলোর রাজত্ব। পুরনো কাঠের মেঝে ক্ৰীঁক-ক্রীঁক করে আওয়াজ করছে। বাইরে, ঝিঁঝিদের একটানা ডাক আর থেকে থেকে ভেসে আসা শেয়ালের হুক্কা-হুয়া ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। অর্ণব নিজের মনকে বোঝালো, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাতাস, ইঁদুর বা পুরনো কাঠ—এই আওয়াজগুলোই ভয়ের গল্প তৈরি করে।
সময় যেন থমকে গেল। এক এক করে প্রতিটা মিনিট পেরোতে লাগল। ৯:৫০... ৯:৫৫...
অর্ণব লক্ষ করল, বাইরের আবহাওয়া অদ্ভুতভাবে শীতল হয়ে আসছে। ভাদ্র মাসের শেষ, এত শীত পড়ার কথা নয়। একটা ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে হাওয়া যেন মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে। তার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে টর্চ জ্বালালো। আলোটা কেমন যেন দূর্বল মনে হলো, যেন অন্ধকারটা সেই আলোটুকুও গিলে ফেলছে।
৯:৫৮। অর্ণব প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে হাঁটতে শুরু করল। রেললাইন দুটো অন্ধকারে সাপের মতো এঁকে-বেঁকে দূরে চলে গেছে। বাতাস যেন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসের মতো বইছে।
অর্ণবের হৃদপিণ্ড দ্রুত হতে লাগল। সে সাংবাদিক, যুক্তি দিয়ে চলে। কিন্তু এই পরিবেশ, এই নিস্তব্ধতা... যেন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে গেছে এখানে।
৯:৫৯। অর্ণব ক্যামেরাটা হাতে তুলে ধরল।
ঠিক রাত দশটা বাজল।
দশটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে, স্টেশনের সব শব্দ যেন এক ধাক্কায় থেমে গেল। ঝিঁঝির ডাক, শেয়ালের হুক্কা-হুয়া, এমনকি বাতাসের শব্দও বন্ধ। নেমে এল এক ভয়াবহ, নিশ্ছিদ্র নীরবতা। এই নীরবতা যেন কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল। কিছু দেখা গেল না। সে হাসল। “ব্যাস? এই তোমাদের ছায়া?”
কিন্তু ঠিক তখনই, সে অনুভব করল তার ঠিক পিছনে, টিকেট কাউন্টারের ভাঙা জানালা দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত তার ঘাড়ে এসে লাগল। এটা সাধারণ বাতাস নয়। এটা যেন চরম শূন্যতার অনুভূতি।
অর্ণব দ্রুত পিছনে ঘুরল।
ছায়ামূর্তির আবির্ভাব
প্রথমে সে কিছুই দেখল না। তারপর তার চোখ অভ্যস্ত হলো অন্ধকারে। প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি, যেখানে একটি পুরনো সিগন্যাল পোস্টের সামান্য কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সে দেখল—কিছু একটা আছে।
সেটা মানুষের মতো লম্বা, কিন্তু তার কোনও নির্দিষ্ট আকার নেই। ঘন, কালো, ধোঁয়ার মতো একখণ্ড অন্ধকার, যা মাধ্যাকর্ষণকে অস্বীকার করে প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে। চাঁদের সামান্য আলো (যা মেঘের আড়াল থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে) তাতে পড়তেই যেন মিলিয়ে যাচ্ছে, শুষে যাচ্ছে। এর কোনো মুখ নেই, হাত নেই, পা নেই—তবুও অর্ণবের মনে হলো, সেটা যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি, যদি তাকে দৃষ্টি বলা যায়, ছিল গভীর শূন্য আর শীতল।
অর্ণবের যুক্তিবাদী মন এক নিমেষে ভেঙে পড়ল। তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক বরফশীতল স্রোত নেমে গেল। সে দ্রুত ক্যামেরা তুলল। ফ্ল্যাশ জ্বালানোর চেষ্টা করল।
ক্লিক... ক্যামেরা চালু হলো না। ব্যাটারি ফুল চার্জ থাকা সত্ত্বেও ডিসপ্লেতে শুধু ‘ব্যাটারি এরর’ লেখাটা ভেসে উঠল। অর্ণব দ্রুত ফোনটা বের করল। ফোনও ডেড। যেন স্টেশনের এই অংশটুকু সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে।
ভয়, যা এতক্ষণ সে ঠেকিয়ে রেখেছিল, তা এখন বন্যা হয়ে তার মনকে গ্রাস করল। সে জানে, এই জিনিস মানুষের তৈরি নয়।
ছায়ামূর্তিটা এবার নড়ে উঠল। তার নড়াচড়া ছিল অস্বাভাবিক মসৃণ, যেন সে বাতাসে ভাসছে। তার ভেসে আসার পথে প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে জমে থাকা ধুলোবালিগুলো একপাশে সরে যাচ্ছে।
অর্ণব তার টর্চটি ছায়াটির দিকে তাক করল। টর্চের আলো ছায়াটির উপর পড়তেই, ছায়াটি যেন আরও গাঢ়, আরও কালো হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই, অর্ণব একটি শব্দ শুনল।
সেটা দীর্ঘশ্বাস নয়, কান্নার শব্দ নয়—সেটা যেন অসংখ্য মানুষের চাপা যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি, যা বাতাসের মধ্যে দিয়ে বয়ে আসছে। আর সেই শব্দের ঠিক মাঝখানে, একটি ভাঙা, করুণ ট্রেন হুইসেলের আওয়াজ।
ছায়ামূর্তি দ্রুত গতিতে অর্ণবের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল।
গোপন রহস্যের উন্মোচন
অর্ণব আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। তার সমস্ত যুক্তি, সাহস মুহূর্তে উড়ে গেল। সে তার ব্যাগ ফেলে রেখে জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে শুরু করল। প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
ছায়াটা তার পিছনে, কিন্তু কোনও শব্দ নেই। এই নিঃশব্দ অনুসরণই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। সে ঘুরে তাকানোর সাহসও পেল না।
অর্ণব সোজা দৌড়ে স্টেশনের মূল ভবনের দিকে গেল। টিকেট কাউন্টার পেরিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল অপেক্ষাগৃহে। অপেক্ষাগৃহের ভেতরে আরও গাঢ় অন্ধকার। এখানে বেঞ্চ, টেবিল সব ভেঙেচুরে একাকার।
অর্ণব একটা ভাঙা বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে পড়ল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত। তার ভয় হচ্ছিল তার হৃদস্পন্দনের শব্দে ছায়াটা না আবার তাকে খুঁজে বের করে ফেলে।
একটু পরেই সে শুনল—না, শুনল না—অনুভব করল, ছায়াটা যেন অপেক্ষাগৃহের মধ্যে ঢুকেছে। ঘরের ঠান্ডা আরও তীব্র হলো। অর্ণব তার হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রইল।
ছায়াটা যেন খুব কাছে এল। অর্ণবের মাথার উপরে, একটা চাপা, করুণ গুঞ্জন। অর্ণব ভয়ে জমে গেল। কিন্তু তার কৌতূহলী সাংবাদিকের মন তাকে পুরোপুরি মরতে দিল না।
গুঞ্জনটা কিছুক্ষণ থাকার পর ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল, যেন ছায়াটা কিছু একটা খুঁজছে।
ছায়াটা প্ল্যাটফর্মের দিকে ফিরে যেতেই, অর্ণব দ্রুত বেঞ্চের নিচ থেকে বেরিয়ে এলো। সে এক সেকেন্ডও নষ্ট করতে চায় না, কিন্তু তার চোখে পড়ল বেঞ্চের নিচে থাকা একটা ছেঁড়া, জরাজীর্ণ কাপড়ের টুকরো। কাপড়টা হাতে নিতেই, তার পকেটে থাকা টর্চটা হঠাৎই জ্বলে উঠল।
আলো ফেলতেই দেখা গেল, ছেঁড়া কাপড়টা আসলে একটা পুরনো, হলদে হয়ে যাওয়া স্টেশন মাস্টারের ইউনিফর্মের অংশ। তার পকেটে ছিল একটা ছোট, মরচে ধরা চাবি এবং একটা ভাঁজ করা পুরনো খবরের কাগজের অংশ।
কাগজের অংশটা কাঁপতে কাঁপতে খুলে ধরল অর্ণব। শিরোনামটা আবছা, কিন্তু পড়া গেল: "নিশাবাঁক জংশনে ভয়াবহ দুর্ঘটনা: স্টেশন মাস্টার সহ ৪ জন নিহত।"
সালটা ছিল ১৯৪৫। খবর অনুযায়ী, রাত দশটা নাগাদ একটি মালবাহী ট্রেন ভুল সিগন্যালের কারণে লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনার সময় স্টেশন মাস্টার বিমল সরকার ডিউটিতে ছিলেন। তদন্তে জানা যায়, লাইনে কোনো ত্রুটি ছিল না—বিমল বাবু নাকি মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন এবং ভুল করে সিগন্যাল ডাউন করে দেন। ফলে, মালবাহী ট্রেনটি এসে একটি লোকাল ট্রেনের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা মারে। ঘটনার তীব্রতায় বিমল সরকার সেখানেই মারা যান।
কিন্তু খবরটির নিচে পেন্সিলে লেখা একটি অস্পষ্ট নোট ছিল, সম্ভবত অন্য কোনো কর্মচারীর হাতে লেখা—"বিমল বাবু ভুল করেননি। কেউ একজন তাকে বাধ্য করেছিল। দশটায় সে চিৎকার করেছিল, কিন্তু কেউ শোনেনি। তার আত্মা আজও ন্যায় চাইছে।"
অর্ণব বুঝতে পারল। দশটার ছায়া হলো বিমল সরকারের ছায়া। সে ভুল সিগন্যালের জন্য দায়ী নয়, সে প্রতারিত বা জোর করে কিছু করতে বাধ্য হয়েছিল। তার আত্মা ন্যায় বা মুক্তির খোঁজে প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ১০টার অ্যালার্মটি হলো সেই অভিশাপের ক্ষণ—যে মুহূর্তে তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
মুক্তি
অর্ণব আর ভয় পেল না, তার জায়গায় এল এক গভীর সহানুভূতি। তার হাতে ছিল বিমল সরকারের শেষ স্মৃতিচিহ্ন—চাবি এবং ইউনিফর্মের অংশ।
সে নিঃশব্দে অপেক্ষা কক্ষ থেকে বেরিয়ে টিকেট কাউন্টারের দিকে গেল। সেখানে একটা কাঠের আলমারি ছিল। মরচে ধরা চাবিটা দিয়ে খুলতেই ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হলো। ভেতরে ছিল পুরনো কাগজপত্র, স্টেশন মাস্টারের রেকর্ড বুক।
অর্ণব দ্রুত রেকর্ড বুকের একটা পাতা ছিঁড়ে নিল। তারপর তার পকেট থেকে কলম বের করে লিখল: "বিমল সরকার নিরপরাধ। আপনার ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে।" সে লেখাটি চাবির সঙ্গে মুড়ে ইউনিফর্মের পকেটে রেখে দিল।
এরপর সে সাহস করে প্ল্যাটফর্মের দিকে গেল। ছায়াটা তখন দূরে, লাইনগুলোর দিকে স্থির হয়ে আছে। যেন সে এখনও তার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে।
অর্ণব ধীরে ধীরে হেঁটে ছায়াটার কাছে গেল। এবার সে আর দৌড়াল না।
“বিমল বাবু,” সে ফিসফিস করে বলল। “আমি জানি। আপনার সঙ্গে অন্যায় হয়েছিল।”
ছায়াটা নড়ে উঠল। তার অন্ধকার শরীরটা যেন সামান্য কেঁপে উঠল। সেই করুণ হুইসেলের শব্দটা এবার আরও কাছে শোনা গেল।
অর্ণব প্ল্যাটফর্মের একটি পুরনো, ভাঙা বেঞ্চের ওপর, যেখানে সম্ভবত বিমল বাবু শেষবার বসেছিলেন, সেখানে তার হাতের ইউনিফর্মের টুকরোটি সাবধানে রাখল। যেন একটা শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
“শান্তি খুঁজুন,” অর্ণব বলল। “আপনার স্মৃতি আমি নিয়ে যাচ্ছি। এই অন্যায় কোনোদিন চাপা পড়বে না।”
অর্ণব দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিলো এবং স্টেশনের বাইরে প্রধান রাস্তার দিকে দৌড়াতে শুরু করল। পিছনে ফিরে তাকানোর সাহস হলো না। তার মনে হলো, ছায়াটা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
রাস্তার দিকে দৌড়ানোর সময়, সে একবার কেবল অস্পষ্টভাবে শুনতে পেল, সেই করুণ হুইসেলের শব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, যেন দীর্ঘদিনের পুরনো এক যন্ত্রণার অবসান হচ্ছে।
ভোরের আলো
অর্ণব যখন নিশাবাঁক জংশন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে এসে পৌঁছাল, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাত কেটে গেছে।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে একটা গাছের নিচে বসে পড়ল। তার হাত-পা কাঁপছে, সারা শরীরে রাতের শৈত্য। কিন্তু তার হাতে তখনও শক্ত করে ধরা ছিল স্টেশন মাস্টারের সেই ছেঁড়া খবরের কাগজের অংশটা।
ভোর হলো। সূর্য উঠল।
অর্ণব ফিরে গেল শহরে। সে জানতো, নিশাবাঁকের গল্পটা সে লিখতে পারবে না। কেউ বিশ্বাস করবে না, আর সে নিজেও হয়তো চায় না বিমল সরকারের শেষ শান্তিটুকু নষ্ট হোক।
কিন্তু অর্ণবের জীবনে একটা পরিবর্তন এলো। সে আর আগের মতো সংশয়বাদী রইল না। সে জানলো, পৃথিবীতে এমন কিছু রহস্য আছে, যা যুক্তির ঊর্ধ্বে।
নিশাবাঁক জংশন আজও দাঁড়িয়ে আছে বাংলার এক প্রান্তে। মানুষ আজও রাত দশটার পরে সেদিকে যায় না। লোকমুখে এখনও ফিসফিস করে ফেরে সেই ছায়ামূর্তির গল্প। কিন্তু অর্ণব জানে, নিশাবাঁকে যে ছায়াটা ঘোরাফেরা করে, সে আর কেবল একটা অভিশাপ নয়, সে একটি ভুলে যাওয়া ন্যায়ের প্রতীক্ষা।
আর অর্ণব? প্রতি বছর, ১৯৪৫ সালের সেই দুর্ঘটনার দিনটিতে, অর্ণব নিঃশব্দে সেই খবর আর চাবির স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে একটি ছোট ট্রেনে করে নিশাবাঁকের কাছে যায়, আর দূরে দাঁড়িয়ে বিমল সরকারের আত্মার শান্তি কামনা করে। হয়তো আজও নিশাবাঁকের প্ল্যাটফর্মে, ঠিক রাত দশটার সময়, সেই করুণ হুইসেলের শব্দ শোনা যায়, কিন্তু তা এখন আর কেবল ভয়ের নয়—সেটা যেন এক অব্যক্ত বিদায়ের সুর। অর্ণব জানে, সে ছায়া হয়তো পুরোপুরি চলে যায়নি, সে শুধু তার একাকীত্বে মুক্তি খুঁজেছে, এবং অপেক্ষা করছে—সেই দিনের, যেদিন পুরো বিশ্ব জানবে, বিমল সরকার নিরপরাধ ছিলেন।

0 Comments