পুবের গ্রাম মহুয়াখালির শেষ প্রান্তে ছিল প্রাচীন শ্মশান। দিনের আলোয় যা ছিল কেবলই পুরোনো চিতা আর ভাঙা কাঠ-খড়ের স্তূপ, রাতের আঁধারে তা হয়ে উঠত এক জীবন্ত বিভীষিকা। আর এই বিভীষিকার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক ভয়ংকর কিংবদন্তি—রুদ্র, শ্মশানের পিশাচ।
রুদ্র, যার সম্পর্কে বলা হতো, সে বহু যুগ আগে কোনো এক পূর্ণিমার রাতে ভুল মন্ত্র আর নরবলির অভিশাপে এই মাটিতে জন্ম নিয়েছিল। তার দেহ নাকি ছিল ছাই আর গলিত মাংসের তাল, চোখদুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো, আর তার কণ্ঠস্বর? সে নাকি ছিল সহস্র কঙ্কালের আর্তনাদের মিলিত ধ্বনি।
মহুয়াখালির মানুষ সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত। বিশেষ করে, শ্মশানের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সরু পথটা। এই পথ দিয়েই পাশের গঞ্জ-বাজারে যাওয়ার সবচেয়ে সোজা রাস্তা ছিল, কিন্তু দিনের বেলা ছাড়া কেউ ভুলেও সেদিকে পা বাড়াত না। লোকে বলত, রুদ্র নাকি রাতের বেলা পথচারীদের গন্ধ পেলেই শ্মশান থেকে বেরিয়ে আসে, তার দীর্ঘ, নখরযুক্ত হাত দিয়ে টেনে নিয়ে যায় চিতার আগুনে। অনেকে নাকি তার পায়ের ছাপও দেখতে পেয়েছে—এক অদ্ভুত আকৃতির, মানুষের মতো নয়, আবার কোনো পশুরও নয়।
গাঁয়ের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের গল্প ছিল নছিরুদ্দিনের। বছর দুই আগের কথা। নছিরুদ্দিন গঞ্জ থেকে ফিরছিলেন এক রাতের বেলা, মদের নেশায় এতটাই চুর ছিলেন যে তিনি শ্মশানের রাস্তাটা ধরে ফেলেছিলেন। শেষ রাতের দিকে, যখন চাঁদটা মেঘের আড়ালে ঢাকা, মহুয়াখালির মানুষ দূর থেকে একটা বিকট চিৎকারের শব্দ শুনেছিল। পরদিন সকালে, শ্মশানের সীমানায় শুধু নছিরুদ্দিনের টর্চলাইটটা আর একজোড়া ছেঁড়া চটি পাওয়া গিয়েছিল। দেহটা? কোনোদিনই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে ভয়টা যেন আর গাঢ় হয়েছিল।
সেই বছর, মহুয়াখালিতে এক নতুন মানুষ এলো। নাম তার জয়ন্ত। সে ছিল এক গবেষক, লোককথা ও কিংবদন্তি নিয়ে তার প্রচুর আগ্রহ। গাঁয়ের মানুষ শ্মশানের গল্প শোনাতে গিয়ে যখন ভয়ে কাঁপছিল, জয়ন্তের চোখে তখন কৌতূহলের ঝলক। সে রুদ্রের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিল—তার ধারণা, স্থানীয় মানুষ ভয় পেয়ে গল্পটিকে বাড়িয়ে তুলেছে, হয়তো কোনো বন্য প্রাণী বা ডাকাতের দল শ্মশানকে আস্তানা করেছে।
জয়ন্ত একদিন ঘোষণা করল, সে ওই রাস্তা দিয়ে রাতের বেলা শ্মশান পেরিয়ে গঞ্জ থেকে হেঁটে ফিরবে। গাঁয়ের মোড়ল থেকে শুরু করে সবাই তাকে বারণ করল, "ওরে বাবা, ওই পথে যেও না! রুদ্র ছেড়ে কথা বলবে না! নছিরুদ্দিনের কথা মনে নেই?"
কিন্তু জয়ন্ত ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সে বলল, "আমি জানতে চাই, সত্যি কী আছে ওই শ্মশানে। হয়তো কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, কোনো পিশাচ নয়।"
ঠিক হলো, অমাবস্যার রাতে সে যাবে। কারণ, সে রাতে রুদ্রের ক্ষমতা নাকি আরও বাড়ে।
সেই রাত এল। চাঁদ ছিল না, আকাশের তারাগুলোও ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা। চারদিক যেন এক ফোঁটা আলোর জন্য হাহাকার করছিল। জয়ন্ত হাতে একটা শক্তিশালী টর্চ, একটি লাঠি আর বুকে একরাশ সাহস নিয়ে শ্মশানের পথে রওনা হলো।
শ্যামলী দিঘি পেরোতেই পথের দু'পাশের গাছপালা আরও ঘন হলো, আর ঠান্ডা বাতাস যেন হাড়ে কাঁপন ধরাচ্ছিল। শ্মশানের সীমানা। জয়ন্ত টর্চটা চারদিকে ঘোরাল। সারি সারি বাঁশ আর শুকনো কাঠ, মাঝে মাঝে আগাছা আর আবর্জনার স্তূপ। সব শান্ত, অস্বাভাবিক শান্ত। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের করুণ সুর।
হাঁটতে হাঁটতে জয়ন্ত ভাবল, "হয়তো গাঁয়ের লোক সত্যিই ভুল বুঝেছে। এ তো কেবলই এক পরিত্যক্ত জায়গা।"
ঠিক তখনই, সে থমকে গেল। টর্চের আলোয় সামনে দেখল—মাটিতে একটা অদ্ভুত দাগ। অনেকটা মানুষের হাতের ছাপের মতো, কিন্তু আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা আর তীক্ষ্ণ নখরের আঁচড় স্পষ্ট। যেন কোনো জীবন্ত জিনিস এই মাত্র মাটি আঁচড়ে পেরিয়ে গেছে। জয়ন্তর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে দ্রুত পা চালাতে শুরু করল।
কয়েক পা যেতেই সে একটা গন্ধ পেল। এক তীব্র, পচা, কটু গন্ধ, যা বর্ণনা করা কঠিন। মনে হলো যেন শত বছরের পুরোনো কোনো মৃতদেহ পচছে তার আশেপাশে। গন্ধটা এতটাই জঘন্য ছিল যে তার বমি আসতে চাইল।
"জয়ন্ত!"—পেছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর তাকে ডাকল।
জয়ন্ত চমকে উঠল। সে জানে, এই পথে তার আশেপাশে কেউ নেই। সে সাহস করে টর্চটা পেছনে ঘোরাল।
আলোটা গিয়ে পড়ল এক বীভৎস দৃশ্যের ওপর। চিতার স্তূপের পাশে, আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একটি অবয়ব। সেটাকে কোনোভাবেই মানুষ বলা চলে না। প্রায় ৭ ফুট লম্বা, তার শরীরটা কালো আর ছাইয়ের মতো, কোথাও কোথাও যেন গলিত চামড়ার মতো চকচক করছে। তার চোখ দু'টো! টর্চের আলোতেও সেগুলো জ্বলন্ত আগুনের মতো লাল দেখাচ্ছিল। তার মুখে কোনো ঠোঁট বা নাক ছিল না, কেবল একটা বিশাল হাঁ। তার নখগুলো ছিল কুকুরের দাঁতের মতো লম্বা আর বাঁকা।
এটাই কি রুদ্র?
পিশাচটা কোনো কথা বলল না, কিন্তু তার মুখ থেকে একটা গোঙানির মতো শব্দ বের হলো, যা শুনে মনে হলো যেন তার সমস্ত শরীরযন্ত্রণা একই সাথে কথা বলছে। পিশাচটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপেই মাটিতে একটা ভারী ধাক্কা লাগছে।
জয়ন্তের হাত থেকে টর্চটা পড়ে গেল। কিন্তু সে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল না। তার গবেষণার সমস্ত কৌতূহল এই মুহূর্তে জমাট বাঁধা ভয়ে পরিণত হয়েছে। সে বুঝতে পারল, এটা কোনো ডাকাত নয়, কোনো বন্য পশু নয়—এ এক অতিপ্রাকৃতিক, অশুভ শক্তি।
সে দ্রুত তার পকেটে হাত দিয়ে তার রৌপ্য লকেটটা বের করল, যেটা তার ঠাকুরমা তাকে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, "এটা অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করবে।"
জয়ন্ত লকেটটা পিশাচটার দিকে তাক করে ধরল।
সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। লকেটের রূপোর ওপর চাঁদের আলো (যদিও চাঁদ মেঘে ঢাকা ছিল, তবুও) যেন এক ঝলক শুভ্র আলো ছড়াল। সেই আলো পিশাচের গায়ে লাগতেই সে এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল, যা কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো।
পিশাচটা দু'পা পেছিয়ে গেল। তার শরীর থেকে যেন ধোঁয়া উঠতে লাগল। সে যেন আলোর কাছে অসহায়।
জয়ন্ত বুঝল, তার এই সামান্য লকেটই তার একমাত্র রক্ষা। সে সাহস সঞ্চয় করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "তুমি কে? কেন তুমি এই পথে মানুষকে ভয় দেখাচ্ছো?"
পিশাচটা তার বীভৎস মুখটা কুঁচকে, গলার সেই হাড়ভাঙা আওয়াজে বলল, "এই শ্মশান আমার... এই পথ আমার! যারা এর ওপর দিয়ে যায়... তারা আমার শিকার... আমার মুক্তি কেবল... তাদের আত্মার আগুনে!"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই, পিশাচটা আবার গোঙাতে গোঙাতে তার দিকে ছুটে এলো। এবার তার গতি ছিল বিদ্যুতের মতো দ্রুত।
জয়ন্ত আর দেরি করল না। সে পেছন দিকে না তাকিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। তার পেছনে পিশাচের ভারী পায়ের আওয়াজ আর সেই বীভৎস শ্বাসের শব্দ। সে প্রাণপণে ছুটছিল।
একসময়, জয়ন্ত পৌঁছালো এক পুরোনো শিবমন্দিরের কাছে, যা শ্মশানের পথ থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত ছিল। মন্দিরটার পাশ দিয়ে একটা ছোট নদী বয়ে গেছে।
জয়ন্ত মন্দিরের সীমানায় প্রবেশ করল। যেই সে মন্দিরের দরজার কাছে পৌঁছাল, পিশাচটা থেমে গেল। রুদ্র আর এগোতে পারল না। মন্দিরের সীমানায় একটি অদেখা শক্তির প্রাচীর যেন তাকে আটকে দিল। রুদ্র প্রচণ্ড ক্ষোভে মাটিতে তার লম্বা নখর দিয়ে আঁচড়াতে লাগল।
জয়ন্ত হাঁপাতে হাঁপাতে মন্দিরের দরজায় ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ পুরোহিত দরজা খুললেন।
পুরোহিত জয়ন্তকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন, "কে তুমি? এত রাতে! আর তোমার পেছনে..."
জয়ন্ত পেছনে তাকাল। দেখল, পিশাচটা এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে শ্মশানের দিকে ফিরে যাচ্ছে। তার শরীরটা অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। তার শেষ গোঙানি বাতাসের সাথে মিশে গেল।
পুরোহিত জয়ন্তকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। পরের দিন সকালে, জয়ন্ত আর সেই পুরোহিত গ্রামের মানুষকে সব জানাল। গাঁয়ের মানুষ এবার রুদ্রের অস্তিত্বে আরও নিশ্চিত হলো।
জয়ন্ত সেই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল, কিন্তু শ্মশানের পথে আর কেউ রাতের বেলা যাওয়ার সাহস করল না। রুদ্রের কিংবদন্তি আরও শক্তিশালী হলো—সে শ্মশানের রক্ষক, যারা সেই পথে যায়, তারা কেবলই তার আত্মার মুক্তিদাতা শিকার।
আর সেই রাত থেকে মহুয়াখালির মানুষ প্রতি অমাবস্যায় শিবমন্দিরে একটি বিশেষ পূজা দিত, যাতে রুদ্র কোনোদিনই তাদের গাঁয়ের দিকে পা বাড়াতে না পারে। শ্মশানের সেই রাস্তাটা আজও আছে, পরিত্যক্ত। দিনের বেলাও কেউ যেতে সাহস করে না—ভয়ে, রুদ্র যদি দিনের আলোয় লুকিয়ে থাকে তার কোনো শিকারের অপেক্ষায়!...see moer

0 Comments