Copyright ©️ 2025 NishirShobdo 
লেখক - শিহাব

প্রথম প্রহর, যখন শহরের নিয়ন আলোও হার মানছিল নিকষ কালো অন্ধকারের কাছে, কলকাতা শহরের এক জীর্ণ গলিপথে এক অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এসেছিল। এই গলিটির নাম 'চুপিসারি গলি'। স্থানীয়দের মতে, এখানে নাকি অনেক পুরনো অশরীরী আত্মার আনাগোনা আছে। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দুটো দশ। শীতল হাওয়া গাছের পাতায় লেগে এক অদ্ভূত ফিসফিস শব্দ তুলছিল, যা রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও গাঢ় করে তুলছিল।


সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে, গলির একপাশে, আধভাঙা সিমেন্টের ফুটপাতের উপর নিথর দেহটি পড়েছিল রোহানের। বয়স তার বাইশ-তেইশ হবে, এক উদীয়মান ফটোগ্রাফার। তার পরনে ছিল একটি কালো জিন্স আর একটি পুরনো ব্যান্ড ছাপানো টি-শার্ট। রাতের আবছা আলোতেও তার মুখমণ্ডলের ভয়াবহতা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। তার মুখে অজস্র কালচে, গভীর দাগ, যেন কোনো তীক্ষ্ণ নখর তার নরম চামড়া ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। চোখ দুটি অর্ধনিমীলিত, তাতে ভয়ের এক হিমশীতল অভিব্যক্তি জমে আছে, যা যেন তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। তার শরীর থেকে তখনো উষ্ণতা পুরোপুরি বিলীন হয়নি, কিন্তু প্রাণহীনতার এক স্পষ্ট ছাপ তাতে বসে গেছে। তার ডান হাতটি বুকের উপর পড়েছিল, মুঠো আলগা, যেন শেষ মুহূর্তে সে কিছু আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল।


রোহানের নিথর দেহ থেকে প্রায় দশ ফুট দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি মেয়ে। তার নাম অনু। তার পরনে ছিল একটি ধবধবে সাদা শাড়ি, যা রাতের আঁধারেও এক অদ্ভুত দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। শাড়ির আঁচল মৃদু বাতাসে সাপের মতো ঢেউ তুলছিল, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে পরিচালিত করছে। অনুর কালো মেঘের মতো ঘন চুলগুলো এলোমেলোভাবে তার মুখমণ্ডলের উপর এসে পড়ছিল, আর বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় সেগুলো আরও উন্মুক্ত হচ্ছিল। কিন্তু অনুর সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি ছিল তার চোখ। সে চোখ দুটি স্বাভাবিক ছিল না; সেগুলো ছিল টকটকে লাল, যেন সদ্য রক্ত পান করে আসা কোনো হিংস্র শিকারীর চোখ। সেই লাল চোখ থেকে এক অদ্ভুত, হিমশীতল আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, যা রাতের আঁধারকে আরও রহস্যময় করে তুলছিল। তার দৃষ্টি ছিল রোহানের নিথর দেহের উপর স্থির, তাতে কোনো আবেগ ছিল না, ছিল শুধু এক জমাট বাঁধা শূন্যতা, এক অসীম ঔদাসীন্য।


অনু খুব ধীরে ধীরে রোহানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তার পদক্ষেপগুলো ছিল প্রায় নিঃশব্দ, যেন সে মাটি স্পর্শ না করেই হাঁটছে। তার পায়ের নূপুরের কোনো রিনঝিন শব্দ ছিল না, কেবল হাওয়ায় শাড়ির ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছিল, যা যেন কোনো প্রাচীন মন্ত্রের মতো মনে হচ্ছিল। যত সে রোহানের কাছাকাছি আসছিল, বাতাসের শীতলতা যেন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো পরিবেশটা যেন অনুর প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে আরও ভারী আর গম্ভীর হয়ে উঠছে, যেন প্রকৃতির সমস্ত শক্তি তার আগমনে স্তব্ধ হয়ে গেছে।


অনু হাঁটু গেড়ে বসল রোহানের পাশে। তার লম্বা, চিকন আঙুলগুলো ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিল রোহানের ক্ষতবিক্ষত মুখের দিকে। তার আঙুলের ছোঁয়ায় এক হিমশীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল রোহানের দেহে, যা মৃতদেহের শেষ অবশিষ্ট উষ্ণতাটুকুও শুষে নিতে প্রস্তুত ছিল। অনুর ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল, যা ভয়ের এক নতুন মাত্রা যোগ করল। সে যেন এক মৃতদেহের শেষ অবশিষ্ট প্রাণটুকুও শুষে নিতে প্রস্তুত ছিল, এক আদিম ক্ষুধা তার লাল চোখে জ্বলছিল।


হঠাৎ করেই অনুর লাল চোখ দুটি স্থির হয়ে গেল। সে তার দৃষ্টি রোহানের মুখ থেকে সরিয়ে এনে আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে মেঘের আড়াল থেকে ক্ষীণ চাঁদের আলো বেরিয়ে আসছিল। সেই আলোয় তার লাল চোখ আরও তীব্র হয়ে উঠল, যেন কোনো অদৃশ্য সংকেত সে গ্রহণ করছে। তার মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটে উঠল—যেন সে কিছু উপলব্ধি করতে পেরেছে, অথবা কোনো আসন্ন বিপদ আঁচ করতে পারছে। এক ঝলক বিভ্রান্তি আর এক অব্যক্ত ভয় তার চোখে খেলা করে গেল।


ঠিক সেই মুহূর্তে, গলিপথের শেষ প্রান্ত থেকে এক তীব্র, হৃদয়বিদারক আর্তনাদ ভেসে এল। আর্তনাদটি ছিল এক মহিলার, যা রাতের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। আর্তনাদটি এতটাই করুণ আর ভীতিকর ছিল যে তা হাড় হিম করে দিচ্ছিল। অনু সেই দিকে তাকাল। তার লাল চোখে যে ভয় দেখা গিয়েছিল, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। সে দ্রুত গতিতে সেই আর্তনাদের উৎসস্থলে ছুটে গেল, তার সাদা শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়তে লাগল, আর তার লাল চোখগুলো অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে গেল, যেন সে এক রহস্যময় ছায়ার মতো অদৃশ্য হয়ে গেল।


গলিপথটি আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল, কেবল রোহানের নিথর দেহটি পড়ে রইল ফুটপাতের ওপর। ভোরের আলো ফুটতে তখনো অনেক বাকি। কেউ জানত না সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল, আর সেই লাল চোখের রহস্যময়ী মেয়েটিই বা কে ছিল। শুধুমাত্র বাতাসের ফিসফিসানিতে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর সত্য, যা উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল।


***


পরের দিন সকালে, যখন ভোরের আলো শহরের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়ল, চুপিসারি গলিতে পুলিশের সাইরেনের শব্দে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হলো। স্থানীয় লোকজন আর উৎসুক জনতার ভিড়ে গলিটি ভরে গেল। পুলিশ যখন রোহানের দেহ উদ্ধার করল, তখন তার মুখমণ্ডলের ভয়াবহ ক্ষতগুলো দেখে সবাই শিউরে উঠল। ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল পরীক্ষা করতে শুরু করল। কিন্তু কোনো ক্লু পাওয়া গেল না। আশেপাশের সিসিটিভি ক্যামেরায় শুধু অস্পষ্ট কিছু ছায়া ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়ল না।


তদন্তের দায়িত্ব পেলেন ইন্সপেক্টর সমরেশ দাস, একজন অভিজ্ঞ এবং কুশলী পুলিশ অফিসার। তার সহকারী ছিল সাব-ইন্সপেক্টর অর্ক। অর্ক ছিল তরুণ এবং স্মার্ট, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ। সমরেশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রোহানের দেহ দেখে বিচলিত হলেন। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড তিনি তার দীর্ঘ কর্মজীবনে খুব কমই দেখেছেন।


“কী মনে হয়, অর্ক? এটা কোনো জন্তুর কাজ, নাকি কোনো মানুষের?” সমরেশ জিজ্ঞেস করলেন।

অর্ক ঝুঁকে রোহানের মুখের দাগগুলো পরীক্ষা করছিল। “দাগগুলো তীক্ষ্ণ নখরের মতো দেখাচ্ছে স্যার। কিন্তু এত বড় ক্ষত কোনো সাধারণ জন্তুর কাজ হতে পারে না। অন্তত, এমন কোনো জন্তু যা শহরে সচরাচর দেখা যায়।”


তদন্ত এগোতে শুরু করল। রোহানের ফোন এবং ল্যাপটপ পরীক্ষা করা হলো। তার শেষ কল লিস্ট, তার ব্রাউজিং হিস্টরি—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হলো। রোহান একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার ছিল। সে সাধারণত রাতে শহরের বিভিন্ন পুরনো বাড়ি বা নির্জন জায়গায় ছবি তুলতে যেত। তার ল্যাপটপে শেষ কিছু ছবিতে দেখা গেল শহরের একটি পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ির ছবি, যা ‘ভূতের বাড়ি’ নামেই পরিচিত ছিল।


“এই জমিদারবাড়িটাই সম্ভবত ওর শেষ গন্তব্য ছিল,” অর্ক বলল। “এখানকার ছবিগুলোতেও কেমন যেন একটা রহস্যময় পরিবেশ রয়েছে।”


সমরেশ জমিদারবাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরদিন রাতে, সমরেশ আর অর্ক দুজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে সেই পরিত্যক্ত জমিদারবাড়িতে গেলেন। বাড়িটি ছিল শহরের উপকণ্ঠে, ঘন জঙ্গলের মধ্যে। লতাপাতা আর শ্যাওলায় ঢাকা বাড়িটি রাতের আঁধারে আরও ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। দরজায় বিরাট তালা ঝুলছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল বহু বছর ধরে কেউ এখানে আসেনি।


তারা তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করল। ভেতরের পরিবেশ ছিল দমবন্ধ করা। ধুলো আর মাকড়সার জালে সবকিছু ঢাকা। প্রতিটি পদক্ষেপে মেঝে থেকে এক অদ্ভূত কড়মড় শব্দ উঠছিল। টর্চের আলোয় তারা একে একে ঘরগুলো দেখতে লাগল। একটি ঘরে তারা কিছু পুরনো ছবি আর ডায়রি পেল। ডায়রিটিতে লেখা ছিল এক পুরনো দিনের গল্প। জমিদারবাড়ির শেষ মালিক ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ রায়, যিনি তার একমাত্র মেয়ে অনুকে খুব ভালোবাসতেন। অনু ছিল অসম্ভব সুন্দরী, কিন্তু তার মধ্যে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছিল।


ডায়রিতে লেখা ছিল, অনু প্রায়ই রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত এবং গভীর রাতে ফিরত। তার আচরণ ছিল অদ্ভুত, আর তার চোখগুলো প্রায়ই লাল দেখাত। জমিদারবাড়ির চাকর-বাকররা বলাবলি করত, অনু নাকি এক পিশাচের সাথে মিশেছে, যে তাকে রাতের বেলায় মানুষের রক্ত পানের জন্য প্রলুব্ধ করে। দেবেন্দ্রনাথ এসব কথা বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু অনুর ক্রমবর্ধমান অস্বাভাবিক আচরণ তাকে চিন্তায় ফেলেছিল।


এক অমাবস্যার রাতে অনু বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি। তাকে বহু খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায়নি। দেবেন্দ্রনাথ শোকে ভেঙে পড়েছিলেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মারা যান। জমিদারবাড়িটি তখন থেকেই পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল।


“অনু? সেই মেয়েটির নামও অনু ছিল?” অর্ক বিস্মিত হয়ে বলল। “আর তার চোখ লাল দেখাতো? এটা কি শুধু কাকতালীয়?”

সমরেশ গভীরভাবে ডায়রিটি পড়ছিলেন। “অর্ক, মনে হচ্ছে আমরা একটা অনেক পুরোনো রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।”


ডায়রির শেষ পাতায় লেখা ছিল, “আমার অনু, সে আর আমার মেয়ে নেই। সে এক শয়তানের শিকার হয়েছে। তার চোখ এখন রক্তের রঙ ধারণ করেছে। আমি তাকে রক্ষা করতে পারিনি। হে ঈশ্বর, আমার অনুকে মুক্তি দাও।”


তদন্তকারীরা বুঝতে পারলেন যে, তারা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এক শতাব্দীর পুরনো এক অভিশাপের সম্মুখীন। রোহান হয়তো ঘটনাক্রমে অনুর মুখোমুখি হয়েছিল, যখন সে সেই অভিশপ্ত জমিদারবাড়ির ছবি তুলতে গিয়েছিল। অনুর অস্তিত্ব হয়তো এখনো এই বাড়ির চারপাশে ঘোরাফেরা করছে, আর রাতের বেলায় সে তার শিকার খুঁজে বেড়াচ্ছে।


সেই রাতে, যখন সমরেশ আর অর্ক জমিদারবাড়ি থেকে ফিরছিল, তারা শুনতে পেল এক চাপা আর্তনাদ। এটি সেই আর্তনাদের মতোই ছিল যা অনুকে রোহানের পাশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। তারা সেদিকে টর্চের আলো ফেলল। দূর থেকে তারা দেখতে পেল একটি ছায়ামূর্তি, সাদা শাড়িতে আবৃত, বিদ্যুতের বেগে ছুটে চলেছে একটি নির্জন কবরস্থানের দিকে। তাদের মনে হলো, যেন সেই ছায়ামূর্তিটির চোখ দুটি টকটকে লাল।


সমরেশ আর অর্ক তৎক্ষণাৎ গাড়ি নিয়ে সেই দিকে ছুটে গেলেন। কবরস্থানটি ছিল শহরের এক কোণে, যেখানে পুরনো সব কবর আর গাছপালা একসঙ্গে মিশে এক ভয়াল পরিবেশ তৈরি করেছিল। তারা কবরস্থানের ভেতরে প্রবেশ করল। চারদিকে শুধু ভাঙা কবর আর আগাছার জঙ্গল। টর্চের আলোয় তারা একটি নতুন খোঁড়া কবর দেখতে পেল। কবরের পাশেই একজন বয়স্ক মহিলা আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিলেন। তার গলায় গভীর আঁচড়ের দাগ।


“অনু! অনু!” সমরেশ ফিসফিস করে বললেন। “তাহলে এই সেই আর্তনাদ!”

অর্ক মহিলাকে পরীক্ষা করল। “উনি বেঁচে আছেন, স্যার। কিন্তু খুব আঘাত পেয়েছেন।”


হঠাৎ তাদের সামনে এসে দাঁড়াল সেই সাদা শাড়ির রহস্যময়ী। তার মুখমণ্ডলে কোনো রক্তমাংসের মানুষের চিহ্ন ছিল না। তার চোখ দুটি থেকে যেন রক্ত ঝরছিল, সেই লাল চোখ স্থির হলো সমরেশ আর অর্কের উপর। তার চুলগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, বাতাসে দুলছে আর দীর্ঘ হচ্ছে।


“তুমি অনু?” সমরেশ সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন।

সেই রহস্যময়ী একটি নিচু, হিসহিসে কণ্ঠে উত্তর দিল, “আমি অনু ছিলাম… এখন শুধু একটি অভিশাপ।”

তার গলার স্বর ছিল শীতল, পাথরের মতো নিথর, তাতে কোনো মানবীয় আবেগ ছিল না।


অর্ক তার পিস্তল বের করে নিশানা করল, কিন্তু সমরেশ তাকে থামিয়ে দিলেন। “অর্ক, পিস্তল নয়। একে সম্ভবত গুলি করে মারা যাবে না।”


অনু হাসল, এক ভয়ংকর, শীতল হাসি। “তোমরা কী ভাবছ? একটি গুলি আমাকে থামাবে? আমি শত বছর ধরে জীবিত আছি, আর এই রক্তচক্ষু আমার অমরত্বের প্রতীক।”

সে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল, তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন কবরস্থানের মাটি কেঁপে উঠছিল। তার শক্তি যেন অসীম।


সমরেশ তখন তার হাতে থাকা পুরনো ডায়রিটি বের করলেন। “আমরা জানি তোমার গল্প, অনু। আমরা জানি তুমি কী হয়েছ। আমরা তোমাকে মুক্তি দিতে এসেছি।”

অনু মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তার লাল চোখে এক ঝলক বিস্ময় দেখা গেল, যেন শত বছর পর কেউ তার নাম ধরে ডেকেছে।


“মুক্তি?” সে হিসহিসে কণ্ঠে বলল। “মুক্তি নেই। রক্ত ছাড়া মুক্তি নেই। এই অভিশাপ আমাকে মুক্তি দেবে না।”


সমরেশ ডায়রির শেষ পাতাটি জোরে জোরে পড়লেন, যেখানে দেবেন্দ্রনাথের শেষ আর্তি লেখা ছিল: “আমার অনু, সে আর আমার মেয়ে নেই। সে এক শয়তানের শিকার হয়েছে। তার চোখ এখন রক্তের রঙ ধারণ করেছে। আমি তাকে রক্ষা করতে পারিনি। হে ঈশ্বর, আমার অনুকে মুক্তি দাও।”


ডায়রির প্রতিটি শব্দ অনুর কানে গিয়ে যেন বজ্রের মতো আঘাত করল। তার চোখ দুটি আরও লাল হয়ে উঠল, কিন্তু এবার তাতে ক্ষোভ নয়, এক অব্যক্ত বেদনা আর যন্ত্রণা দেখা গেল। তার মুখমণ্ডলে শত বছরের জমে থাকা কষ্ট ফুটে উঠল।


“বাবা…” সে ফিসফিস করে বলল। এই একটি শব্দে শত বছরের দুঃখ আর একাকীত্ব মিশে ছিল।


অনু হঠাৎ করেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার দেহ থেকে এক তীব্র আলো বিচ্ছুরিত হতে শুরু করল, যা পুরো কবরস্থানকে আলোকিত করে তুলল। তার সাদা শাড়ি আর লাল চোখ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল, যেন এক অশরীরী সত্তা তার দেহ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সেই আলো ক্রমশ উজ্জ্বল হতে হতে একসময় বিস্ফোরিত হয়ে গেল, আর সেই বিস্ফোরণের পর সেখানে শুধু রইল মাটির ঢিবি আর পুরনো গাছপালা।


সেই স্থানে অনুর কোনো দেহাবশেষ ছিল না, ছিল শুধু একটি সাদা শাড়ির টুকরো, যা বাতাসে উড়ে সমরেশ আর অর্কের পায়ের কাছে এসে পড়ল। শাড়ির সেই টুকরোতেও কোনো রক্ত বা ময়লার চিহ্ন ছিল না, শুধু ছিল সময়ের ছাপ।


সমরেশ আর অর্ক দুজনই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারা যা দেখল, তা তাদের সারা জীবনের বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দিল। তারা একটি মানুষকে নয়, একটি অভিশপ্ত আত্মাকে মুক্তি দিয়েছিল।


তারা দ্রুত মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। মহিলা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন, কিন্তু সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতি তার মন থেকে কখনোই মুছে যায়নি।


চুপিসারি গলি আর জমিদারবাড়ির রহস্য উন্মোচিত হয়েছিল। রোহানের হত্যা ছিল এক শতাব্দীর পুরনো অভিশাপের শেষ শিকার। অনু অবশেষে মুক্তি পেয়েছিল, তার বাবা দেবেন্দ্রনাথের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে।


কিন্তু শহরের মানুষের মনে চিরকালই সেই লাল চোখের রহস্যময়ীর ভয় রয়ে গেল। তারা রাতের বেলায় চুপিসারি গলি এড়িয়ে চলত, আর কখনো কখনো তারা শুনতে পেত বাতাসে এক ফিসফিসানি, যেন অনুর আত্মা শান্তির খোঁজে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথবা হয়তো তার মুক্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।


সমরেশ আর অর্ক এই ঘটনার পর অনেক বদলে গিয়েছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, যা মানবীয় ধারণার বাইরে। লাল চোখের অভিশাপ হয়তো শেষ হয়েছিল, কিন্তু তার রেশ রয়ে গিয়েছিল সেই নীরব শহরের প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি মানুষের মনে।...see moer