গোধূলির আবছা আলোটুকু মিলিয়ে যাওয়ার পর যখন রাতের ঘোর অন্ধকার গ্রাস করল প্রকৃতিকে, তখন মামুনের মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগছিল। এটি ভয়ের শিহরণ নয়, বরং বুনো এক উত্তেজনা। সে আজ বড়ই আত্মবিশ্বাসী, কারণ পূর্ণিমার রাতে বড় বিলের মাছেরা নাকি বেশ নড়াচড়া করে। গত কয়েকদিন ধরে সে এই রাতেরই অপেক্ষা করছিল। তার ছোট ডিঙি নৌকাটি ঠেলে নিয়ে বিলের মাঝখানে পৌঁছাল মামুন। সঙ্গে শুধু লণ্ঠন আর মাছ ধরার জাল।
বিলের চারদিকে নীরবতা। দূরে শিয়াল পন্ডিতরা এক-আধটু ডেকে উঠছে, আর ঝিঁঝির অবিরাম গুঞ্জন রাতের স্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তুলছে। মামুনের হাতে জাল, চোখে সতর্ক দৃষ্টি। একমনে সে অপেক্ষা করে আছে। প্রথম টান দিতেই তার জাল ভরে উঠল বড় বড় রুই, কাতলা আর মৃগেল মাছে। আনন্দে মামুনের বুক ফুলে উঠল। এক কোণে সে মাছগুলো জমিয়ে রাখছিল।
রাত যত গভীর হতে থাকল, মামুনের ভাগ্য তত খুলতে থাকল। তার ছোট্ট ডিঙি নৌকাটা যেন মাছের ভাণ্ডারে পরিণত হলো। বড় বড় মাছের ছটফটানি, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, আর মামুনের চাপা হাসি—এই নিয়েই বিলের মাঝখানে এক অন্যরকম জগৎ তৈরি হয়েছিল।
হঠাৎ বাতাস ঠান্ডা হয়ে এল। আকাশে মেঘ জমে চাঁদকে ঢেকে দিল। চারদিকে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। শিয়ালের ডাক, ঝিঁঝির গুঞ্জন—সব যেন মুহূর্তে থেমে গেল। মামুন বুঝল, এটা ভালো লক্ষণ নয়। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলত, রাতের গভীরে বিলের মাঝে এমন নীরবতা মানেই অশুভ কিছু ঘটছে। সে যত দ্রুত সম্ভব বিলের পাড়ে ফিরে যেতে চাইল।
কিন্তু তার নৌকা যেন নড়ছে না। জল যেন থমকে গেছে। মামুন চারদিকে তাকিয়ে দেখল, দূরে একজোড়া লাল চোখ জ্বলছে। প্রথমে সে ভাবল, এটা হয়তো কোনো শেয়ালের চোখ। কিন্তু যখন সেই চোখগুলো দ্রুত তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল, তখন তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
ভয়ের চোটে মামুনের হাত-পা যেন অবশ হয়ে এল। সে দেখল, লম্বা, সরু এবং কালো রঙের এক অবয়ব জলের উপর দিয়ে হেঁটে তার নৌকার দিকে এগিয়ে আসছে। তার শরীর যেন জলেরই তৈরি। মুখে ছোট ছোট আঁশের মতো কিছু একটা ঝলমল করছে। লম্বা হাত, তাতে ধারালো নখ। আর তার মুখে লেগে আছে এক হিংস্র হাসি। এই দৃশ্য দেখে মামুনের বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। তার মনে পড়ে গেল গ্রামের লোকেদের বলা সেইসব গল্প। বিলের এই অংশে নাকি এক মেছো জ্বীন থাকে, যে বিলের মাছের লোভে মাঝেমধ্যে চলে আসে।
জ্বীনটা তার নৌকায় উঠে পড়ল। তার পায়ের ছোঁয়ায় নৌকাটি যেন একপাশে হেলে গেল। মেছো জ্বীনটা নিঃশব্দে মামুনের পাশে গিয়ে বসল। মামুনের মনে হলো, তার শরীরের সব রক্ত যেন জমাট বেঁধে গেছে। সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
জ্বীনটা বসে বসে মামুনের ধরা মাছগুলো খাওয়া শুরু করল। প্রথমে সে একটা বড় রুই মাছ তুলে নিল। তার ধারালো দাঁত দিয়ে মাছের মাংস ছিঁড়ে খেতে লাগল। মাছের রক্ত জলের সাথে মিশে এক অদ্ভুত গন্ধ তৈরি করল। মামুন চোখ বন্ধ করেই অনুভব করতে পারছিল, জ্বীনটা তার মাছগুলো খাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, জ্বীনটা কেবল ক্ষুধার্ত নয়, বরং একটা অশুভ সত্তা।
এক সময় মামুনের রাগ আর ভয় একসঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত সাহস জন্মাল। সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। দেখল, জ্বীনটা তার সবচেয়ে বড় মাছটা—একটা বিশাল কাতলা—খেতে শুরু করেছে। মামুন ভাবল, "আমি আমার সারারাতের পরিশ্রমের ফল কিছুতেই এই অপদেবতাকে খেতে দেব না।"
হঠাৎ মামুন তার হাতে থাকা লণ্ঠনটা তুলে জ্বীনটার দিকে ছুড়ে মারল। জ্বীনটা যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। লণ্ঠনটা তার গায়ে লাগতেই জ্বীনটা বিকট শব্দ করে উঠল। তার শরীর থেকে ধোঁয়া উঠতে লাগল। আগুনের তাপে জ্বীনের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে দেখে মামুন একটা ঝটকা মেরে নৌকা থেকে ঝাঁপ দিল। তার হাতে থাকা জালটা সে জ্বীনের গায়ে ছুড়ে মারল।
জ্বীনটা তখন রাগে উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। "তুই আমাকে আঘাত করেছিস! এর মূল্য তোকে দিতে হবে, মানুষ!"—জ্বীনটা হিংস্রভাবে গর্জন করে উঠল।
জালের জালে জ্বীনটা আটকে গেল। কিন্তু তার শক্তি ছিল অসাধারণ। সে জাল ছিঁড়ে ফেলল। এই সুযোগে মামুন সাঁতার কেটে পাড়ের দিকে যেতে লাগল। জ্বীনটা তার দিকে জল ছিটিয়ে দিল। সেই জল মামুনের চোখে-মুখে পড়তেই তার ত্বক জ্বলে উঠল।
মামুন কোনোমতে পাড়ে পৌঁছাল। সে পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল, জ্বীনটা তার নৌকাটা ভেঙে দিচ্ছে। নৌকাটা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, আর সেই মেছো জ্বীন তার বিকৃত হাসি হাসছে। মামুন দৌড়ে গ্রামে ফিরে গেল। তার সারা শরীরে জ্বালা, আর মনে গভীর ভয়।
পরদিন সকালে মামুন কয়েকজনকে নিয়ে বিলে গেল। তার ভাঙা নৌকার টুকরোগুলো জলের উপর ভাসছিল। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল দৃশ্যটি। তার নৌকার ভাঙা অংশগুলোতে মানুষের হাতের ছাপ দেখা যাচ্ছিল, আর তাতে লেগে ছিল রক্তের দাগ। মামুন নিশ্চিত, সেগুলো তার নিজের রক্ত।
সেই ঘটনার পর থেকে মামুনের জীবনে শান্তি বলে কিছু ছিল না। রাতের বেলা সে ঘুমাতে পারতো না। তার কানের কাছে ফিসফিস করে কেউ যেন বলে যেত, "তুই আমাকে আঘাত করেছিস, এর মূল্য তোকে দিতে হবে।" মামুনের শরীর থেকে জ্বীনটার ছিটানো জলের কারণে এক অদ্ভুত দুর্গন্ধ আসতো। ডাক্তার-কবিরাজ কেউ এর কারণ বলতে পারতো না। তার সারা শরীরে মাছের আঁশের মতো ছোট ছোট দাগ দেখা দিতে লাগল।
গ্রামের লোকেরা তাকে মেছো জ্বীনের অভিশাপগ্রস্ত বলে ডাকত। তার কাছ থেকে সবাই দূরে থাকতে শুরু করল। মামুন দিনে দিনে একা হয়ে পড়ল। তার খাওয়া-দাওয়া কমে গেল। সে সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকত, কারণ সে জানত মেছো জ্বীনটা ফিরে আসবে।
এক রাতে মামুন বিলের পাড়ে বসেছিল। তার চোখে-মুখে হতাশা আর ভয়। সে দেখতে পেল, বিলের জল কালো হয়ে যাচ্ছে। দূরে সেই লাল চোখ জ্বলতে শুরু করেছে। মেছো জ্বীনটা এবার আরও বড়, আরও ভয়ংকর হয়ে ফিরে এসেছে। মামুন বুঝল, এবার তার পালানোর কোনো উপায় নেই। জ্বীনটা তাকে খুঁজে বের করেছে।
জ্বীনটা মামুনের দিকে এগিয়ে এসে হিংস্রভাবে বলল, "আমি তোর জন্য অপেক্ষা করেছি, মামুন। তুই আমার অপমান করেছিস। এবার আমি তোর জীবনের শেষ মাছ ধরেছি।"
মামুন কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। জ্বীনটা তার দিকে তাকিয়ে এক বিকৃত হাসি হাসল। তারপর সে মামুনের সারা শরীরে হাত বুলাতে লাগল। মামুনের শরীরের চামড়া তখন নরম হয়ে যেন জলের মতো তরল হতে লাগল।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা বিলের পাড়ে একটি মানুষের শরীরের কঙ্কাল খুঁজে পেল। তাদের ধারণা, এটি মামুনের। কিন্তু কঙ্কালটি ছিল জলের মতোই ঠান্ডা আর ভেজা। আর তার শরীরে লেগে ছিল মাছের মতো আঁশ।
গ্রামের লোকেরা ভয়ে আর বিলে মাছ ধরতে যেত না। তারা বিশ্বাস করত, বিলের জল এখন মেছো জ্বীনের অভিশাপে দূষিত। আর মামুন নামের সেই সাহসী জেলে এখন নিজেই একটি মেছো জ্বীনে পরিণত হয়েছে। সে হয়তো রাতের আঁধারে বিলের মাঝখানে ঘুরে বেড়ায়, আর নতুন শিকারের জন্য অপেক্ষা করে।
এই গল্প শেষ হয় না। রাতের বিলের চারপাশে এখনো শোনা যায় একটি করুণ কান্নার শব্দ, আর মাঝেমধ্যে দেখা যায় একটি ভেজা, আঁশযুক্ত হাত জলের নিচ থেকে কিছু খোঁজার চেষ্টা করছে—যেন সে এখনও সেই রাতের মাছ আর তার হারানো জীবন ফিরে পেতে চায়। কিন্তু যা একবার মেছো জ্বীনের অভিশাপে অভিশপ্ত হয়, তা কি আর কখনো স্বাভাবিক
জীবনে ফিরে আসতে পারে?

0 Comments