রাত তখন প্রায় ৯টা। গ্রামের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের একটানা চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। আকাশে চাঁদ থাকলেও তার আলো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছিল, যার ফলে চারপাশটা আরও বেশি ভয়ানক হয়ে উঠেছিল। আমি পুকুর পাড়ে বসে হেডফোনে গান শুনছিলাম, যেন প্রকৃতির এই নীরবতা আর নিজের একাকীত্বের সঙ্গে মিশে যেতে চাইছিলাম।

হঠাৎ গানের শব্দ ছাপিয়ে একটা চাপা আর্তনাদ আমার কানে ভেসে এলো। আমি চমকে উঠলাম। মনে হলো যেন কেউ খুব ভয়ে চিৎকার করছে। দ্রুত হেডফোন খুলে তাকালাম। আমার বোন আর মামি ওয়াশরুম থেকে ছুটে আসছে। তাদের মুখ সাদা হয়ে গেছে, চোখেমুখে আতঙ্ক।

আমি দ্রুত তাদের কাছে গেলাম। আমার বোন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো, "দাদা, আম গাছে কে যেন বসে আছে!"

আমি প্রথমে ভাবলাম, হয়তো তাদের ভুল হয়েছে। "কে বসে থাকবে? হয়তো কোনো প্যাঁচা হবে।"

"না দাদা, ওটা মানুষ ছিল। লম্বা সাদা পোশাক পরা একটা লোক। ঘাড় বাঁকিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল।" আমার বোন কথাগুলো বলতে বলতে কাঁপছিল। তার কথা শুনে আমারও শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। আমি বললাম, "চলো, ঘরে যাই।"

আমরা তিনজন দ্রুত ঘরে ফিরে এলাম। ঘরে ঢোকার পর মামি বললেন, "আমাদের পাশ দিয়ে একটা ঠান্ডা বাতাস চলে গেল। মনে হলো যেন কেউ আমাদের পিছু নিয়েছিল।" সেই রাতে আর কারও চোখে ঘুম ছিল না। পরদিন সকালে আমি সাহস করে আম গাছের নিচে গেলাম। গাছের নিচে পড়ে থাকা শুকনো পাতার উপর কিছু পায়ের ছাপ দেখলাম। কিন্তু সেগুলি মানুষের পায়ের ছাপ নয়, যেন একটি লম্বাটে পায়ের ছাপ। ছাপগুলো গাছের নিচ থেকে পুকুরের দিকে চলে গেছে। ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠলো। আমি বুঝলাম, গত রাতে আমার বোন আর মামি যা দেখেছিল, তা কোনো সাধারণ মানুষ ছিল না।

এর পরের কয়েকদিন আমাদের বাড়িতে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল। কেউ আর রাতে একা বাইরে যেত না। সন্ধ্যা হলেই সব জানালা-দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো। কিন্তু সেই নীরবতা খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। এক রাতে, ঘুম ভেঙে দেখি আমার বোন বিছানায় নেই। আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। তাকে খুঁজতে খুঁজতে দেখি সে ধীরে ধীরে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বের হচ্ছে। আমি চুপি চুপি তার পিছু নিলাম। সে যেন কোনো অশরীরী শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে হাঁটছে। আমি তাকে থামানোর জন্য ডাকতে চাইলাম, কিন্তু আমার গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হলো না।

আমার বোন পুকুর পাড়ের সেই আম গাছের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। গাছটির নিচে পৌঁছানোর পর সে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। আমি গাছের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেই সাদা পোশাক পরা লোকটা গাছের ডালে বসে আছে। তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সে আমার বোনের দিকে হাত বাড়াল। আমার বোনও যেন সম্মোহিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। চিৎকার করে বোনের নাম ধরে ডাকলাম।

আমার চিৎকারে সেই সাদা পোশাক পরা লোকটা আমার দিকে তাকাল। তার মুখে একটা বিকৃত হাসি। সে এবার আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন মাটি কেঁপে উঠছিল। আমি ভয়ে পেছনে সরে গেলাম। ঠিক তখনই আমাদের বাড়ির পোষা কুকুরটা সেই লোকটার দিকে তেড়ে এলো এবং ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে লাগল।

কুকুরের একটানা ডাকে বাড়ির সবাই জেগে উঠলো। বাবা আর মামা টর্চ নিয়ে ছুটে এলেন। তারা আমাকে আর আমার বোনকে দেখতে পেলেন, কিন্তু সেই সাদা পোশাক পরা লোকটাকে নয়। সে যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। আমার বোন তখন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। আমরা তাকে দ্রুত ঘরে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার এসে বললেন, সে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছে। কয়েকদিন পর আমার বোন স্বাভাবিক হয়ে গেল, কিন্তু তার চোখেমুখে সেই ভয় আর আতঙ্কের ছাপ থেকে গেল।

সেই ঘটনার পর থেকে আমাদের পরিবার আর সেই বাড়িতে থাকেনি। আমরা শহরে চলে এসেছি। কিন্তু আজও যখন কোনো পূর্ণিমার রাতে চাঁদ ওঠে, আমার মনে পড়ে সেই আম গাছের কথা। সেই বিকৃত হাসির কথা, যা আমাকে আজও তাড়া করে বেড়ায়। আমি জানি, সেই সাদা পোশাক পরা লোকটা এখনও সেই আম গাছের ডালে বসে আছে। অপেক্ষা করছে নতুন কোনো শিকারের জন্য। এবং মাঝে মাঝে সে যেন আমার স্বপ্নেও এসে হাজির হয়, তার জ্বলন্ত চোখ আর বিকৃত হাসি নিয়ে।


আমাদের পরিবার সেই বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেই ভয় আমাদের পিছু ছাড়েনি। শহরের এই ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালের মধ্যেও আমি তার অস্তিত্ব অনুভব করি। প্রতি পূর্ণিমার রাতে, যখন চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেয়, আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি শুনতে পাই, আমার জানালার বাইরে কেউ যেন হেঁটে যাচ্ছে। শুকনো পাতার খসখস শব্দ হয়, ঠিক যেমনটা সেই আম গাছের নিচে হতো।

এক রাতে সাহস করে আমি জানালা খুলেছিলাম। কেউ ছিল না, কিন্তু আমি জানি, সে ছিল। সে গাছের ডালে বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তার হাসিটা ছিল বিকৃত, আর তার জ্বলন্ত চোখ দুটো যেন এখনও আমার স্বপ্নে তাড়া করে বেড়ায়।

আমার বোনও এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। সে প্রায়ই ফিসফিস করে বলে, "দাদা, সে আমাকে এখনও ডাকে। তার ডাকে আমি সাড়া দিতে বাধ্য।" আমি জানি, এই ভয় থেকে আমাদের মুক্তি নেই। এই গল্প কোনোদিন শেষ হবে না। কারণ সেই অশুভ শক্তিটা এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি। সে আমাদের সঙ্গেই আছে।

সে শুধু আমার বোনকে নয়, এখন আমাকেও তাড়া করে বেড়ায়। প্রতি রাতে আমার কানে ফিসফিস করে বলে, "আমি আসছি। আমি তোমাদের নিতে আসছি।" আমি জানি, এই ভয়ের সমাপ্তি কেবল মৃত্যুতেই সম্ভব। এবং আমি জানি, সেই মৃত্যু খুব বেশি দূরে নয়।

গল্পটা এখানেই শেষ নয়। কারণ এখনও প্রতি রাতে সেই অশরীরী শক্তি আমাদের পিছু ছাড়েনি। সেই ভয় এখনও আমাদের সঙ্গে আছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি স্বপ্নে সে লুকিয়ে আছে। আর এক দিন সে আমাদের পুরোপুরি গিলে ফেলবে। আর তখন আমি আর আমার বোন তার হাতের পুতুল হয়ে যাব। আর আমাদের আত্মা তার দখলে চলে যাবে। ...see moer

ঘটনা এখনও চলমান....