লেখক: নুর
বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এখানকার প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি নৌকার হাহাকার, আর গ্রীষ্মের রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক—সবই আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামের সহজ-সরল জীবনে বড় হতে হতে কত যে গল্প শুনেছি অশরীরী, ভূত, প্রেত আর জ্বীন নিয়ে! কেউ বলতো, সূর্যাস্তের পর এক সাদা শাড়ি পরা বুড়ি নাকি নদীর কিনার ধরে হেঁটে বেড়ায়। তাকে যারা দেখেছে, তাদের নাকি কোনো দিন আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার কেউ বলতো, মাঝরাতে নদীর পাড়ে একা থাকলে সকালে তার মৃতদেহ নাকি ভেসে ওঠে!
তবে আমি এসব কথায় কান দিতাম না। আমার কাছে এসব কেবলই মানুষের ভয় থেকে জন্ম নেওয়া কল্পনা বলে মনে হতো। যুক্তি-বুদ্ধির এই যুগে এসে এসব রূপকথা বিশ্বাস করাটা বোকামিই মনে করতাম। কিন্তু সেই দিনের সেই ঘটনা আমার সব ধারণা, সব বিশ্বাসকে একেবারে ওলটপালট করে দিলো। সেদিন জরুরি একটা কাজে আমাকে মামার বাড়ি যেতে হয়েছিল। কাজ শেষ করে যখন ফিরছি, তখন সূর্যের শেষ আলো প্রায় নিভে আসছে। মামার পরিচিত এক চাচার মোটর নৌকায় উঠেছিলাম। তিনি আমাকে গঞ্জ পর্যন্ত নামিয়ে দিয়ে বললেন, "আর যেতে পারবো না, বাবা। আমার কাজ আছে। বাকি পথটা একা যেতে পারবি?"
আমি হাসিমুখে উত্তর দিলাম, "চাচা, আমি গ্রামের ছেলে। ভয় পাই না।"
আসলে আমার বুকের ভেতরে তখন একটা চাপা ভয় কাঁপছিল, যা আমি খুব যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছিলাম। আকাশে তখনো শেষ বিকেলের হালকা লালচে আভা, আর কীর্তনখোলার ঢেউগুলো সেই আলোয় যেন জ্বলজ্বল করছিল। বাতাসটাও ছিল ভেজা আর রহস্যময়, যেন কোনো অজানার পূর্বাভাস। আমার বাড়ি ফেরার জন্য দুটো রাস্তা ছিল। একটি ছিল সোজা, সাধারণ রাস্তা—আরাম করে হাঁটলে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগতো। অন্যটি ছিল এক শর্টকাট রাস্তা—জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গেছে। ১৫ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যেত, কিন্তু পথটা ছিল ভয়ঙ্করভাবে নিস্তব্ধ আর অন্ধকার। গ্রামের মানুষজন সাধারণত এই পথ এড়িয়েই চলতো। সেদিন বাংলাদেশের খেলা ছিল ইংল্যান্ডের সঙ্গে। আমি দ্রুত বাড়ি ফিরে খেলা দেখতে চাইছিলাম। তাই লোভ সামলাতে না পেরে সেই শর্টকাট পথটাই ধরলাম।
প্রথম কিছু মিনিট পথটা স্বাভাবিকই লাগছিল। দূর থেকে ভেসে আসছিল কুকুরের করুণ ডাক। হঠাৎ করেই চারপাশের প্রকৃতি কেমন যেন অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আমার অতি পরিচিত ছিল, সেটাও হঠাৎ থেমে গেল। কানে কেবল নিজের জুতোর শব্দ আর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ একজন অন্ধকারে আমাকে অনুসরণ করছে, কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ডানপাশের ঝোপের ভেতর "ধপ" করে একটা শব্দ হলো। আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। আমি থমকে দাঁড়ালাম। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলাম। না, আর কোনো শব্দ নেই। কেমন যেন এক কৌতূহল জেঁকে বসলো আমার মনে। ধীরে ধীরে, খুব সাবধানে, আমি ঝোপের দিকে এগোলাম। ঝোপের কাছাকাছি আসতেই আমার নাকে একটা পচা, তীব্র দুর্গন্ধ এসে লাগলো। অনেকটা পচা মাংস আর রক্তের মিশেল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। আমি দম আটকে উঁকি দিলাম। প্রথমে কিছুই দেখতে পেলাম না, কেবল ঘন অন্ধকার। ধীরে ধীরে আমার চোখ অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করলো।
তারপর যা দেখলাম, তা আমার শরীরের সমস্ত রক্ত এক নিমেষে হিম করে দিলো। মাটিতে এক সাদা কাপড় পরা মহিলা ঝুঁকে বসে আছে। তার হাত দুটো মাটির ওপর অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে। মনে হচ্ছিল, সে কিছু একটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা ভয়াল "কড়মড়... কড়মড়..." শব্দ ভেসে এলো। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সে কোনো কিছুর হাড় চিবিয়ে ভাঙছে! ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল, তবুও কোনোমতে মুখ দিয়ে বের হলো, “ক-কে ওখানে?”
মহিলা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। তারপর ধীরে ধীরে সে মুখটা তুললো।
সেটা কোনো মানুষের মুখ ছিল না। চোখ দুটো লাল আগুনের মতো জ্বলছিল। ঠোঁট থেকে চিবুক পর্যন্ত কাঁচা রক্তের ধারা নেমে আসছে। দাঁতের ফাঁকে এখনো কাঁচা মাংসের টুকরা আটকে আছে। তার সামনে পড়ে আছে একটা গরুর মৃতদেহ। মাথা থেকে বুক পর্যন্ত নেই, শুধু মেরুদণ্ডের হাড় বেরিয়ে আছে। শরীরের ভেতর থেকে গরম ধোঁয়ার মতো বাষ্প বের হচ্ছে। মহিলা হঠাৎ এক পশুর মতো গর্জন করে উঠলো। মানুষের গলার নয়, যেন কোনো বুনো জানোয়ারের হিংস্র চিৎকার। সেই চিৎকারে চারপাশের বাতাস যেন কেঁপে উঠলো। তারপর সে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে গরুর দেহ ছেড়ে আমার দিকে হামাগুড়ি দিতে শুরু করলো। তার লম্বা, কালচে নখগুলো মাটিতে আঁচড় কাটছিল— “খসখস... খসখস...”। আমি ভয়ে জমে গেলাম। মরিয়া হয়ে পড়তে শুরু করলাম, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ... আল্লাহু আকবর...”
কিন্তু আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। শরীর যেন জমে গেছে, পা নড়ছিল না। মহিলা তার মুখ হাঁ করে আমার দিকে এগিয়ে এলো, দাঁতের ফাঁকে তখনো রক্ত ঝরছে। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। ঠিক সেই মুহূর্তে চারপাশে এক অদ্ভুত হাহাকার শোনা গেল—যেন হাজারো কুকুর একসাথে চিৎকার করছে। কানে বাজছিল এক ভয়াবহ কান্নার শব্দ। তারপর... আমার আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো, নিজেকে আবিষ্কার করলাম আমাদের বাড়ির উঠোনে। চারপাশে মানুষের ভিড়। এলাকার মুরুব্বিরা, বড় হুজুর বসে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রহমত আলি চাচা আমাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “তোকে তো ওই শর্ট রাস্তার কাছে পাইছিলাম বাবা। তুই অজ্ঞান হইয়া পড়ছিলি।”
কিন্তু এরপর যে খবরটা শুনলাম, তাতে আমার শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে গেল। যেখানে আমি অজ্ঞান হয়েছিলাম, সেখানেই নাকি আধখাওয়া গরুর মৃতদেহটা পাওয়া গেছে। মাথা থেকে বুক পর্যন্ত নেই, ভেতরের সবকিছু যেন কেউ টেনে ছিঁড়ে নিয়েছে। সেই দিনের পর আর কখনো আমি ওই শর্ট রাস্তা দিয়ে যাইনি। আজও মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে যায়—কানে বাজে সেই কড়মড় শব্দটা, আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই জ্বলন্ত লাল চোখ দুটো। আমি এখন বুঝি, কিছু কিছু ভয় মানুষের কল্পনার বাইরে, বাস্তবের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।...see moer

0 Comments