দীর্ঘ দুই মাস পর গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলাম। আল্লাহর কৃপায় সব কিছু ঠিকঠাক চলেছে। শহরের অফিসের কাজ শেষ করে যখন ট্রেনে চেপেছিলাম, তখনও মন ভরে ছিল গ্রামে ফিরে যাওয়ার আনন্দে। স্টেশন নামার সময় সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। আকাশ গাঢ়, গরমের মধ্যে বাতাস ভারী, যেন কালবৈশাখী ঝড় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। স্টেশন থেকে গ্রামের বাড়ি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। সাধারণত রিকশা বা মোটরভ্যান খুব সহজেই পাওয়া যায় তবে আজ কোথাও গাড়ি নেই। হয়তো সবাই বুঝে গেছে, ঝড়-বৃষ্টি আসছে। বাধ্য হয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ব্যাগগুলো ভারী, এক হাতে ধরা, এক হাতে তালি দিয়ে সামান্য সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা। পনেরো মিনিট হাঁটলে একটা বড়ো মাঠের ধারে পৌঁছালাম। এখান থেকে গ্রামের ঘরগুলো দেখা যায়। মাটির পথ ধরে ছোট ছোট দোকান খোলা, কিন্তু মানুষজন কেউ বের হয়নি—ঝড়ের আগে সবাই ঘরে। আমি হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে দোয়া পড়ছিলাম, “বিসমিল্লাহ, আল্লাহ্ আমাকে নিরাপদ রাখুন।”
হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকাল। ঝড় শুরু হয়ে গেল। মাঠের ধুলো উড়তে লাগল। বাতাস যেন মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ব্যাগ নিয়ে হাঁটার গতি বাড়ালাম। দূরে, মাঠের এক প্রান্তে একজন মানুষ দেখা গেল। প্রথমে ভাবলাম ধূসর ছায়া, কিন্তু বিদ্যুতের ঝলকে পরিষ্কার হল—আমাদের গ্রামের হারুণদা। তিনি গমকলের কাজে যেতেন -
"ও হারুণ ভাই!" আমি ডাকলাম। তিনি পিছন ফিরে তাকালেন।
"ও তুই! এতদিন পরে ফিরলি?" তিনি বললেন।
"হ্যাঁ, আল্লাহর কৃপায় ফিরেছি। চল, একসাথে যাই।"
আমরা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলাম।
"এই ঝড়ের মধ্যে বাইরে কেন বের হয়েছেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"ঐ, খাবার আনতে। আল্লাহর রহমতে নিরাপদে আছি।"
"ঠিক আছে, তবে সতর্ক থাকুন।"
"আল্লাহর কাছে সব কিছু।"
বৃষ্টি হালকা হালকা পড়তে শুরু করল। হঠাৎ, মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেল। আকাশে এক ঝলক আলোর মতো আলো জ্বলল। হারুণ ভাইয়ের গলার চিৎকার শুনে আমি থমকে গেলাম। দূরে তাকালাম, হারুণ ভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। তাঁর হাতে ধরা খাবারের থলি। সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে এক বিকট শব্দ, যেন সৃষ্টির সমস্ত শক্তি থেমে গেছে। বুঝলাম, বজ্রপাতে মারা গেছেন। আমি ধপ করে মাটিতে বসে পড়লাম। হৃদপিণ্ড এমন জোরে ধক্ধক্ করছে যেন হাতের মধ্যে চলে আসবে। পাশেই একজন মানুষের মৃত্যু, আর আমি বেঁচে আছি, এটাই আল্লাহর কৃপা।
![]() |
| Copyright ©️ nishir shobdo |
হারুণ ভাইয়ের মৃতদেহ বৃষ্টিতে ভিজছে। চোখ-মুখ রক্তমাখা। আমি ব্যাগ ফেলে চিৎকার করে বাড়ির দিকে ছুটলাম। মনে হচ্ছিল, মৃত্যু কখন, কোথায় এবং কীভাবে আসে—সেটি আল্লাহ্ই জানেন। হারুণ ভাইয়ের শেষ মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে আমি অনুভব করলাম, আমাদের জীবন কত অস্থির। আজকের দিনটা মনে করিয়ে দিলো, আল্লাহর সুরক্ষা ছাড়া কেউ নিরাপদ নয়। হারুণ ভাইয়ের মৃতদেহ ফেলে বাড়ির দিকে ছুটে যাওয়ার পরও হৃদয় শান্ত হল না। বৃষ্টি ঝমঝম করছিল, বাতাসের সঙ্গে মাটির ধুলো মিশে ধোঁয়ার মতো বাতাসে ঘোরানো হচ্ছিল। আমি থেমে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে মুখ মুছলাম, তারপর নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। “আল্লাহ্! আমাকে নিরাপদ রাখো, আমাকে সহায়তা করো।”
মাঠ পেরিয়ে মাটির পথ ধরতেই মনে হলো—কিছু অদ্ভুত আছে। বাতাসের সঙ্গে কোনো অদৃশ্য শক্তি ঘুরছে, যেন কেউ আমাদের পথ দেখছে। পেছন দিকে তাকাই, হারুণ ভাইয়ের মৃতদেহ বৃষ্টিতে ভিজছে, আর পাশে কোনো মানুষ নেই। মনে হলো, বজ্রপাতের ধ্বনিটি যেন এখনও বাতাসে অনুবাদ হচ্ছে, একটি নীরব চিৎকারের মতো। আমি আরও এগোলাম। মনে হচ্ছিল, একেক ধাপের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ আরও গাঢ় হচ্ছে। বিদ্যুৎ কখনো কখনো এমনভাবে ঝলসে, যেন আল্লাহর ইচ্ছা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে, এই মুহূর্তে আমরা ক্ষুদ্র, প্রকৃতির কাছে নীরব। হঠাৎ দূরে, পথের বাঁকে এক ছায়া নড়ছে। শুরুতে ভাবলাম গাছের ছায়া, কিন্তু বিদ্যুতের ঝলকে পরিষ্কার হয়ে গেল—একটি অস্পষ্ট মানবাকৃতি, যাকে প্রথমে চিনতে পারিনি। আমার হৃদয় থমকে গেল। চোখে চোখ রাখতে চেষ্টা করলাম, দোয়া পড়তে পড়তে। "বিসমিল্লাহ..."
ছায়াটির দিকে এগোলাম। যত কাছে এলাম, তত বুঝলাম, কেউ নেই। তবে বৃষ্টির মধ্যে লাফিয়ে ওঠা ধুলো এবং বাতাসে ভেসে থাকা ঠাণ্ডা হাওয়া যেন কোনো শক্তির উপস্থিতি জানাচ্ছে। আমার দৃষ্টি হারানো শুরু হল, মনে হলো পথটি দীর্ঘতর, ঘন জঙ্গল যেন দূরত্ব বাড়াচ্ছে। পিছন ফিরে দেখার সাহস পেলাম না। শুধু ভিজে ভিজে হাঁটছিলাম, ব্যাগের ভারে শারীরিক ক্লান্তি, আর মানসিক ভয় একসাথে আমাকে কাঁপাচ্ছিল। হঠাৎ, দূরে বিদ্যুৎ আরেকবার ঝলকায়। এবং তখনই শুনলাম—এক অদ্ভুত মৃদু কান্নার মতো শব্দ। মনে হলো, কেউ ডেকে বলছে—“সাহস কর, এগো…”। আমার বুক দোলা খাচ্ছে, কিন্তু মনে মনে বললাম, “আল্লাহ্! আমাকে শক্তি দাও।” যত এগোলাম, রহস্য আরও গভীর হচ্ছে। ঝড়ের শব্দ, বজ্রপাতের চমক, বাতাসে উড়ে আসা ধুলো—সবকিছু যেন এক সঙ্গে মিলিত হয়ে আমাকে পরীক্ষা করছে। মনে হলো, এই পথ শুধু শারীরিক নয়, আত্মিকও। মৃত্যু এবং জীবন কত কাছাকাছি, তা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ, একটা গাছের নিচে কিছু অদ্ভুত ঝাপসা চিত্র লক্ষ্য করলাম। মনে হলো, কেউ বসে আছে। কাছাকাছি গেলাম, কোনো মানুষ নেই, তবে মাটিতে ভেজা পায়ের ছাপ এবং একটি ছোট্ট কাগজ পড়েছে। কাগজের ওপর লেখা আছে, “সৎ পথে থাকো, আল্লাহর নিকট ফিরে যাও।”
চোখের সামনে এই লিপিটি দেখেই হৃদয় ঠাণ্ডা হয়ে গেল। বুঝলাম, গ্রামে ফিরে আসা মানে শুধু ঘর নয়, আল্লাহর কৃপার আশ্রয়। ঝড়, বজ্রপাত, এবং অদৃশ্য শক্তি—সবই আমাদের সতর্ক করছে। আমি ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোলাম। পায়ের প্রতিটি ধাপ যেন দোয়া ও আতঙ্কের মিশ্রণ। মনে মনে বলছিলাম, “আল্লাহ্! যে মৃত্যু আজ হারুণ ভাইয়ের কাছে এসেছে, আমাকে তা থেকে রক্ষা করো। আমাকে জীবন দাও, সঠিক পথে চলার শক্তি দাও।”
বৃষ্টি এখন আরও জোরে। কিন্তু আমি জানি, এই ঝড়ের মধ্যেও আল্লাহর রহমত আছে। মৃত্যু যে কোথায় আসে, কে জানে? তবে বিশ্বাসে থাকলেই সুরক্ষা। হারুণ ভাইয়ের মৃত্যুর দৃশ্য আমার কাছে একটি স্মরণ হয়ে রইল—মৃত্যু এবং জীবনের পার্থক্য কত সূক্ষ্ম। আমি যখন বাড়ির দরজায় পৌঁছলাম, তখন বৃষ্টি প্রায় থামতে শুরু করেছে। মাটির উঠান পিচ্ছিল, ভেজা মাটির গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে আছে। ঘরের দরজা খুলে আমাকে দেখে মা চমকে উঠলেন -
"বাবা, এতো ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কেন এলি? রিকশা পাসনি?" তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না, শুধু ভেজা কাপড় এবং মুখে লেগে থাকা মাটির দাগ দেখে তিনি হয়তো কিছুটা আন্দাজ করলেন। আমি চুপচাপ ভেতরে ঢুকে জামা বদলাতে লাগলাম। মা গরম দুধ নিয়ে এলেন।
"কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে?"
আমি কাপটা ধরে বসে রইলাম। হারুণ ভাইয়ের চেহারাটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। বজ্রপাতের বিকট শব্দটা এখনো কানে বাজছে, যেন চারপাশের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে।
"মা, হারুণ ভাই..." অবশেষে কথা বের হলো। "হারুণ ভাই আর নেই।"
মা হতবাক হয়ে তাকালেন। "কী বলছিস? কী হয়েছে?"
আমি তখন সবকিছু বললাম, কীভাবে স্টেশনে নেমেছিলাম, ঝড়ের মধ্যে কীভাবে হারুণদার সঙ্গে দেখা হলো, আর কীভাবে চোখের সামনে বজ্রপাতে তার মৃত্যু হলো। মা আমার কথা শুনে মাথায় হাত দিলেন। "লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!" তিনি দোয়া পড়তে লাগলেন। "আল্লাহ্! হারুণকে বেহেশত নসিব করুন। আর তোকে যে বাঁচিয়েছেন, সে কেবল তারই মেহেরবানি।"
আমার বুকে জমে থাকা ভয়টা যেন মায়ের কথায় একটু একটু করে হালকা হলো। তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন, কিন্তু আমার মনের মধ্যে সেই দৃশ্যটা আটকে ছিল। হারুণ ভাইয়ের সেই শেষ হাসি, শেষ কথা, আর তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়া। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই—এই সহজ সত্যিটা আমার কাছে এত নির্মমভাবে স্পষ্ট হলো যে আমি শিউরে উঠলাম। রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসছিল না। ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, ঝড়ের পরে আকাশ শান্ত, কিন্তু আকাশে এখনো মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হারুণ ভাইয়ের মৃতদেহ নিয়ে কী হয়েছে তা জানতে ইচ্ছে করছিল। আমাদের গ্রামের মানুষ হয়তো এতোক্ষণে সেখানে পৌঁছে গেছে। তারা কি হারুণদাকে চিনতে পেরেছে? তার পরিবারের খবর কী?
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখির কিচিরমিচির শব্দে। মনে হলো, গতরাতের সবটাই একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। কিন্তু উঠানে বেরিয়ে দেখি, সবাই হারুণদার মৃত্যুর খবর জেনে গেছে। পুরুষেরা দলবেঁধে মাঠের দিকে যাচ্ছেন। আমি তাদের সঙ্গে মিশে গেলাম। মাঠের মাঝখানে হারুণদার মৃতদেহ রাখা আছে, চারপাশে ভিড়। গ্রামের লোকেরা শোক প্রকাশ করছে। হারুণ ভাইয়েরর স্ত্রী, হালিমা, এবং তার দুই ছোটো সন্তান সেখানে বসে কাঁদছিল। তাদের কান্না শুনে আমার বুক ভেঙে আসছিল। কাল রাতে আমি তাদের জীবনসঙ্গী এবং পিতাকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখেছি, কিন্তু তাদেরকে কিছু জানাতে পারিনি। আমি তাদের সামনে যেতে পারলাম না, কারণ আমি জানি, হারুণ ভাইয়ের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে আমি আর কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারব না। লাশটাকে কাঁধে তুলে নেওয়া হলো। জানাজার জন্য সবাই প্রস্তুত। আমি পেছন থেকে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, হারুণ ভাই এখনো বেঁচে আছে, কেবল ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু তার মুখটা দেখতে পেলাম না, তার মুখটা কাপড়ে ঢাকা ছিল। আমার কেবল মনে হচ্ছে, হারুণ ভসি মারা যাননি। তিনি শুধু তার পার্থিব জিবনের যাত্রা শেষ করেছেন মাত্র।
আমাদের সবার জীবনও এমন এক যাত্রাপথ, যেখানে শেষটা কোথায় বা কীভাবে হবে, তা কেবল আল্লাহ্ই জানেন। আমি তার মৃতদেহের কাছে গিয়ে নীরবে দোয়া করলাম। সেই কাগজের কথা মনে পড়ল। "সৎ পথে থাকো, আল্লাহর নিকট ফিরে যাও।"
এই বার্তাটা যেন হারুণদার জীবনেরই শেষ বার্তা ছিল, যা তিনি আমাকে দিয়ে গেলেন। আমার গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসা শুধু একটি শারীরিক যাত্রা ছিল না, এটি ছিল আমার জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে আমি বুঝতে পারলাম, জীবন কত ভঙ্গুর এবং বিশ্বাস ছাড়া সবকিছুই অর্থহীন। আমার গল্প এখানেই শেষ হলো, কিন্তু হারুণ ভাইয়েরর মৃত্যু আমার কাছে চিরকালের জন্য একটি স্মৃতি হয়ে রইল। এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান, এবং প্রতিটি শ্বাসই আল্লাহর মেহেরবানি।...see moer


0 Comments