লেখক - মৃদুল হাসান
আমি তেমন একটা ব্যাডমিন্টন খেলতে পারতাম না, তবুও একদিন বন্ধুর মহল্লায় খেলার জন্য চলে গেলাম। তখন হয়তো পরীক্ষা শেষের ছুটি ছিল। খেলাটা হতো রাতে, যেটা আসলে আমাদের পরিবার কখনোই অনুমতি দিত না। কিন্তু ওইদিন একদিনের জন্য আমি গিয়েছিলাম।
খেলতে খেলতে কখন যে রাত ১১টা বেজে গেল, তা টেরই পাইনি। আমাদের বাড়ি থেকে বন্ধুর বাড়ি অনেকটা দূরে, প্রায় ১.৫ থেকে ২ কিলোমিটার, হয়তো তারও বেশি। আর জায়গাটা অনেকটা গ্রামাঞ্চল। রাত ৯টার পরেই পুরো রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়, ১১টার পর তো রাস্তার পাশে একটা মাছিও নেই।
সেদিন আমাকেই একা হেঁটে বাড়ি ফিরতে হচ্ছিল। আমার সাথে কোনো আলো ছিল না, আশেপাশে মানুষও নেই। ফিরতে গিয়ে একটা নদীর ঘাট পড়ে। নদীর পাশ দিয়ে গেলে রাস্তা ছোট হয়, তাই সেই পথেই হাঁটা শুরু করলাম।
কিন্তু নদীর ঘাটে আসতেই নানা ভয়ংকর চিন্তা মাথায় ভর করল। হঠাৎ মনে হলো, আমি যেন নদীতে লাশ ভাসতে দেখছি। চোখের সামনে যেন অনেক লাশ ভেসে যাচ্ছে। ভয়ে গা কাঁটা দিয়ে উঠল।
ঘাট পার হয়ে সামনে একটা ইটভাটা ছিল, তারপরই একটা পুরনো মন্দির। মনে হল হয়তো মন্দিরে কারো দেখা পাব, কিন্তু সেটাও খালি। তখন শুধু মনে হচ্ছিল, সামান্য কিছু রাস্তা বাকি, যদি এটুকু পার হতে পারি তবে বাড়ি পৌঁছে যাব।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই পথে কয়েকটা জায়গা ছিল যেগুলো নিয়ে ছোটবেলায় ভয়ংকর গল্প শুনেছি। তার মধ্যে একটি ছিল পুরনো শিমুল গাছ। কথিত আছে, সেখানে নাকি আগুনের গোলা দেখা যায়, আর রক্ত দিয়ে লেখা কিছু লেখা থাকত। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সত্যিই গাছটিতে সেরকম কিছু লেখা আছে!
তারপর একটা গাব গাছ, যেখানে নাকি পিশাচ থাকত। আরও সামনে ছিল একটা কালভাট, যেখানে অনেক মানুষ গাড়ি চাপায় মারা গিয়েছিল। এসব মনে পড়তেই বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।
আমি নিজেকে বললাম — যতই ভয় লাগুক, পিছনে তাকাব না। শুধু সোজা হাঁটব। সাথে ছিল শুধু আমার বাটন ফোন, তার হালকা টর্চের আলোয় হাঁটা শুরু করলাম।
মন্দির পার হয়ে যখন শিমুল গাছের কাছে এলাম, তখন দেখলাম — সামনে একটা সাদা আলখেল্লা পরা অদ্ভুত লম্বা এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। এত লম্বা যে, তার মুখ উপরে তাকিয়েও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। পাঞ্জাবি এত লম্বা ছিল যে মাটির সাথে লেগে যাচ্ছিল। মুখ বা চোখ কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শুধু সাদা লম্বা দাড়ি, যা অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছিল।
লোকটা নদীর দিকে মুখ করে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। বুঝতে পারছিলাম না সে নদীতে কী দেখছিল। আমি তখন মনের ভেতর দোয়া পড়তে শুরু করলাম। চোখের দিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করলাম, লোকটার পাশ দিয়ে চলে গেলাম।
শিমুল গাছ পার হয়ে বাঁশঝাড়ে পৌঁছাতেই মনে হলো লোকটা আমার পেছনে পেছনে হাঁটছে। ঠান্ডা বাতাসে হাত-পা জমে যাচ্ছিল, অথচ কানে গরম হাওয়ার মতো লাগছিল। রাস্তা মাত্র ২–৩ মিনিটের, কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে।
আমি একবারও পিছনে তাকাইনি। বাঁশঝাড়, গাব গাছ, কালভাট — সব পার হয়ে অবশেষে বাড়ির কাছে পৌঁছে গেলাম। বাড়ির ফটক খুলে ভেতরে ঢুকে বাইরে আলো জ্বালিয়ে দেখলাম — রাস্তা ফাঁকা। আমার পেছনে কেউ নেই।
তবুও আমি যেন অনুভব করছিলাম, সেই সাদা আলখেল্লা পরা লম্বা মানুষটি আমার পেছন পেছন এসেছিল। হয়তো সে কোনো খারাপ কিছু ছিল না, বরং ভালো কোনো জিন, যে আমাকে সেই ভয়ংকর জায়গাগুলো থেকে রক্ষা করে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল।...see moer

0 Comments