কুড়িগ্রামের সেই দিনগুলো আমার জীবনের অন্যতম অদ্ভুত স্মৃতি হয়ে আছে। তখন এইচএসসি পরীক্ষা চলছে। পড়াশোনার চাপ, মানসিক টেনশন—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময়। হোস্টেলের ভিড়ভাট্টা, ঝগড়াঝাঁটি আর অশান্তি থেকে বাঁচার জন্যই আমি কলেজের কাছেই একটি ভাড়া বাসায় উঠে এলাম। ভেবেছিলাম, শান্ত পরিবেশে পড়াশোনার সুবিধা হবে। বাসাটা ছিল সাদামাটা। একতলা বাড়ি, দেয়ালে শ্যাওলা জমে আছে, রাত হলে চারপাশে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। বাড়িওয়ালা একজন বৃদ্ধ চাচা, সরল মানুষ। তিনি প্রায়ই সন্ধ্যায় উঠোনে বসে বিড়ি টানতে টানতে এলাকার পুরনো গল্প শোনাতেন।


আমার অভ্যাস ছিল ভোরে উঠে মসজিদে যাওয়া। নামাজের সুরে মনটা শান্ত হয়, মনে হয় দিনের শুরুটা ভালো হলো। সেই মসজিদটা ছিল পুলিশের এসপি সাহেবের বাসার ঠিক বিপরীতে। লোকচক্ষুর ভিড় নেই, ভোরে চারপাশে শুধু কুয়াশা আর নিরবতা। সেদিনও ঘুম ভাঙল আজানের সুরে। চারপাশে তখনও অন্ধকার, আকাশে ম্লান তারার আলো। বাতাসে হালকা শীত, যেন প্রতিটি শ্বাসে ঠান্ডা কাঁপুনি নেমে আসছে শরীরে। আমি অজান্তেই হাত ঘষে শরীর গরম রাখতে লাগলাম।


গলির পথ দিয়ে হাঁটছি। চারদিকে ভিজে মাটির গন্ধ, কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠল, আবার থেমে গেল। সেই নীরবতার ভেতরে আমার জুতার শব্দ যেন অস্বাভাবিক জোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কয়েক মিনিট হাঁটার পর সামনে পড়ল রেললাইন। ভোরবেলায় লাইনটা যেন অন্য রকম লাগে—কালো লোহার চকচকে দাগ, দু’পাশে ঘাস ভিজে কুয়াশায় মিশে আছে। লাইনের ওপাশেই মসজিদটা দাঁড়িয়ে।


আমি ধীরে ধীরে লাইন পার হলাম। ঠিক তখনই চোখ আটকে গেল। আমার সামনে কিছুটা দূরে একজন হাঁটছে। আলখাল্লা পরা, মাথায় টুপি। ভেবেছিলাম—আরেকজন মুসুল্লি, নামাজ পড়তে যাচ্ছেন। কিন্তু কয়েক কদম হাঁটার পর বুকের ভেতর ধক করে উঠল। লোকটির উচ্চতা ছিলো অস্বাভাবিক লম্বা। গড় মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। এত লম্বা মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। মনে হচ্ছিল তার মাথা কুয়াশার ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তিন-চার হাত দূরে গিয়ে পড়ছে। আমার শরীর ঠান্ডায় কাঁপছিল না, ভয়েই কাঁপছিল। বুকের ভেতর ধড়ফড় শব্দ এত জোরে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল চারপাশে সবাই শুনতে পাবে। তবু দৃষ্টি সরাতে পারছিলাম না।


লোকটা ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ডান দিকে ঘুরে গেল। আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। চোখ কুঁচকে ভালো করে তাকালাম। ডান দিকে যেখানে সে গেল, সেখানে কোনো রাস্তা নেই। শুধু একটি বিশাল ডোবা। বর্ষার পানি জমে ছোটখাটো পুকুরের মতো হয়ে আছে। জলের গাঢ় কালো আভা যেন গভীর অন্ধকার গহ্বরের মতো লাগছিল। কিন্তু সেখানে কোনো বাড়িঘর নেই, কোনো পথ নেই। কেউ সেখানে গেলে সোজা জলে পড়ার কথা।


আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে নিজেকে বোঝাতে চাইলাম—হয়তো আমি ভুল দেখছি। হয়তো তাড়াহুড়া করে মসজিদের ভেতরে ঢুকে গেছে। কিন্তু অন্তরে এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে আসছিল। আমি দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম। মসজিদের গেটের সামনে পৌঁছে দেখি, ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন শুধু মুয়াজ্জিন সাহেব। অন্য কেউ নেই। মসজিদের চারপাশে কুয়াশা জমে আছে, বাতাসে অদ্ভুত ভারী গন্ধ।


আমি অবাক হয়ে চারপাশে তাকালাম। এসপি সাহেবের বাসার গেট তখনও বন্ধ। সেই বিশাল লোহার গেট খোলার সময় যে বিকট শব্দ হয়, তা আমি না শুনে যাব—এটা অসম্ভব। প্রশ্নটা মাথার ভেতরে ধাক্কা দিতে লাগল। আমার মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে গেল। নামাজ শেষে আমি দ্রুত বেরিয়ে এলাম। রাস্তাটা এখন আরও ভয়ার্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিল কুয়াশার ভেতরে লম্বা মানুষটা এখনও কোথাও দাঁড়িয়ে আছে, আমার প্রতিটি পদক্ষেপ দেখছে।বাসায় ফিরে সাহস করে বৃদ্ধ বাড়িওয়ালা চাচাকে বললাম ঘটনাটা।


চাচা চুপচাপ বিড়ি ধরালেন, তারপর ধোঁয়া ছেড়ে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা। ধীরে ধীরে বললেন—

“তুমি একা না বাবা। ওই মসজিদের আশেপাশে এমন এক লম্বা মানুষকে অনেকেই দেখেছে। ভোরবেলা কিংবা গভীর রাতে। ও হঠাৎ এসে আবার হঠাৎ মিলিয়ে যায়। কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়—কেউ জানে না।”


চাচার গলা ভারী হয়ে আসছিল। আমার বুকের ভেতর ধপধপানি আরও বেড়ে গেল। মনে হলো, আমি যেন কোনো ভিন্ন জগতে ঢুকে পড়েছি—যেখানে সবকিছু বাস্তব অথচ অবাস্তবের ছায়ায় মোড়া। সেদিন রাতটা আমি চোখে ঘুম আনতে পারিনি। কানে বারবার ভেসে আসছিল ভোরবেলার সেই নিস্তব্ধতা, অস্বাভাবিক পায়ের শব্দ, আর কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে যাওয়া লম্বা মানুষের ছায়া...


সেই ঘটনার পরের রাতটা আমি প্রায় জেগেই কাটালাম। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছিল কুয়াশার ভেতরে হারিয়ে যাওয়া সেই অস্বাভাবিক লম্বা মানুষটির অবয়ব। ভোর হতে না হতেই বুকের ভেতরে এক অজানা ভয়ের স্রোত নেমে আসছিল—আবার যদি সামনে পড়ে যাই? তবু অভ্যাসের টানে উঠে দাঁড়ালাম। নামাজ না পড়লে মন শান্ত হয় না। কিন্তু সেদিন বেরোনোর সময় শরীরটা কেমন ভারী লাগছিল। যেন প্রতিটি পদক্ষেপ টেনে নিয়ে যাচ্ছি। গলির ভেতর দিয়ে হাঁটছি। চারপাশে ঘন কুয়াশা, হাত বাড়ালেও আঙুল দেখা যায় না। ভেজা মাটির গন্ধ নাকে এসে লাগছে। হঠাৎই মনে হলো, আমার পেছনে কারও পায়ের শব্দ।


আমি থেমে গেলাম। চারদিকে কেবল কুয়াশার দেয়াল, কোনো মানুষ নেই। আবার হাঁটতে শুরু করলাম। কিছু দূর যেতে না যেতেই আবার সেই শব্দ—একটা ভারী পা মাটিতে পড়ছে, যেন মাটি কেঁপে উঠছে। ঘাড়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সাহস করে পেছনে তাকালাম। কেউ নেই। শুধু ধোঁয়াটে কুয়াশা, আর নিরবতা। আমি দ্রুত পা চালালাম। রেললাইন পার হয়ে ঠিক সেই জায়গায় এসে থামলাম যেখানে আগের দিন সেই লম্বা মানুষটা অদৃশ্য হয়েছিল। ডান দিকে তাকালাম। ডোবার কালো পানি স্থির, কিন্তু মনে হলো যেন ঢেউ তুলছে। কুয়াশার ভেতরে কারও অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হলো। খুব দ্রুত চোখ মুছলাম, আবার তাকালাম—কেউ নেই।


তবু বুকের ভেতরে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ অদৃশ্য হয়ে আমার ঠিক পাশে হাঁটছে। মসজিদের সামনে এসে দেখি, আজও ভিতরে কেউ নেই, শুধু মুয়াজ্জিন সাহেব। তাঁর কণ্ঠস্বর অদ্ভুতভাবে ভারী শোনাচ্ছিল। গম্বুজের ভেতরে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল। আমি নামাজ পড়তে দাঁড়ালাম। কিন্তু মনে হচ্ছিল, আমার ডান দিকে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেলাম না। ঠান্ডা ঘামে শরীর ভিজে যাচ্ছিল। নামাজ শেষে দ্রুত বেরিয়ে এলাম। বাসায় ফেরার পথে সাহস করে আবার বাড়িওয়ালা চাচাকে বললাম—

—“চাচা, আজ আবার অদ্ভুত শব্দ শুনলাম। মনে হলো কেউ পেছনে হাঁটছে, কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি।”


চাচা বিড়ি ধরাতে ধরাতে থেমে গেলেন। তাঁর চোখে হঠাৎ ভয় নামল। নিচু গলায় বললেন—

—“বাবা, ওসব কথা বেশি উচ্চারণ কোরো না। এই এলাকার পুরনো লোকজন বলে, বহু বছর আগে ওই ডোবার ধারে এক অদ্ভুত মানুষ মারা গিয়েছিল। কেউ বলে উনি ছিলেন এক ফকির, আবার কেউ বলে অন্য কিছু... তার দেহ পাওয়া যায়নি, শুধু আলখাল্লা ভেসে উঠেছিল পানির ওপর।”


আমার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। কানে তখনও ভেসে আসছিল ভোরের সেই ভারী পায়ের শব্দ। চাচা ফিসফিস করে যোগ করলেন—

—“রাতে বা ভোরে ওই লম্বা মানুষকে দেখা যায়। কিন্তু কেউ কাছে যেতে পারে না। যারা কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা আর স্বাভাবিক থাকেনি।”


চাচার কথায় শরীর কাঁপতে লাগল। মনে হচ্ছিল, কুয়াশার ভেতর থেকেই কেউ আমাদের কথা শুনছে। আকাশে তখন সূর্য উঠতে শুরু করেছে, কিন্তু আমার কাছে ভোরটা আরও অন্ধকার লাগছিল। আমি ভেতরে ভেতরে বুঝতে পারছিলাম—এই রহস্যময় লম্বা মানুষ শুধু একদিনের ঘটনা নয়। ও যেন এই জায়গার সাথে, এই মসজিদের সাথে চিরস্থায়ীভাবে বাঁধা। কিন্তু কেন? আর কতদিন আমাকে এর মুখোমুখি হতে হবে?


সেই ঘটনার পর প্রতিদিন ভোরে মসজিদে যাওয়ার সময় বুকের ভেতর ভয় জমে থাকত। চোখে না দেখলেও কানে ভেসে আসত অদৃশ্য পায়ের শব্দ, ডোবার ধারে অচেনা ছায়া। তবু আমি কাউকে কিছু বলতাম না। শুধু নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত চাপা আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতাম। এক সকালে নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম কলেজের বন্ধু রায়হানও এসে হাজির। অবাক হয়ে বললাম,

—“তুই এখানে? তোকে তো আগে কখনো দেখি নাই!”


রায়হান কেমন যেন ফ্যাকাশে মুখে বলল,

—“দোস্ত, আজকেই প্রথমবার আসছি। বাসায় ঘুম ভাঙলো না, তাই ভোরে হাঁটতে বের হইছিলাম। মসজিদের পথে আসতে আসতে… কেমন জানি ভয় লাগলো।”


আমি চুপ করে গেলাম। কেমন ভয়? জিজ্ঞেস করার আগেই ও নিজে থেকে বলল—

—“তুই বিশ্বাস করবি কিনা জানি না… একটু আগে রেললাইন পার হবার পর সামনেই একজনকে দেখলাম। আলখাল্লা পড়া, মাথায় টুপি। কিন্তু মানুষটা এত লম্বা যে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। একসময় দেখি সে ডানদিকে ঘুরলো। কিন্তু ভাই, সেখানে তো কিছুই নাই! আমি ভয় পেয়ে দৌড়াইয়া মসজিদে চলে আসছি।”


রায়হানের কথায় আমার বুক ধক করে উঠল। চোখেমুখে ভয় আর ঘাম ঝরছিল ওর। তাহলে ব্যাপারটা শুধু আমার চোখেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা সত্যি। পরদিন সাহস করে মসজিদের ইমামের সাথে কথা বললাম। ইমাম সাহেব বয়সে প্রবীণ, সাদা দাড়ি, কণ্ঠস্বর শান্ত। আমি সব ঘটনা খুলে বলতেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।


—“তুমি একা নও বাবা। আমিও বহু বছর ধরে এই এলাকায় আছি। মসজিদের আশেপাশে মাঝে মাঝে এরকম অদ্ভুত ছায়া দেখা যায়। অনেকেই সেই লম্বা মানুষকে দেখেছে। কিন্তু তার রহস্য আজও অমীমাংসিত।”


আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে উনি কে?”


ইমাম সাহেব তাকালেন কুয়াশাচ্ছন্ন জানালার বাইরে, তারপর ধীরে বললেন—

—“আল্লাহই ভালো জানেন। তবে শোনা যায়, বহু বছর আগে এই জায়গায় এক অজানা ফকির বাস করতেন। গভীর রাতে তিনি একাই নামাজ পড়তেন। একদিন তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। শুধু তাঁর আলখাল্লা ভেসে উঠেছিল ডোবার পানিতে।”


আমার শরীর কেঁপে উঠল। মনে হলো, ভোরের কুয়াশার ভেতর এখনও সেই আলখাল্লার ছায়া ভেসে বেড়ায়। কিছুদিন পর পরীক্ষা শেষ হলো। এক রাতে আমি দেরি করে পড়াশোনা করছিলাম। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে গেছে। বাতাসে অদ্ভুত ঠান্ডা শীতলতা। হঠাৎই মনে হলো, বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সাহস সঞ্চয় করে জানালার কাছে গিয়ে তাকালাম। ডোবার ধারে অস্বাভাবিক লম্বা এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আলখাল্লা পরা, মাথায় টুপি। তাঁর ছায়া কুয়াশার ভেতর মিশে গেছে। কিন্তু স্পষ্ট বুঝলাম—তিনি আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। আমি চিৎকার করতে পারছিলাম না, নড়তেও পারছিলাম না। শুধু চোখের সামনে দেখলাম ধীরে ধীরে সেই অবয়ব কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেল।


পরদিন সকালে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর এই বাসায় থাকব না। পরীক্ষার বাকি দিনগুলো অন্য জায়গায় কাটালাম। কিন্তু আজও, যখন গভীর রাতে চোখ বন্ধ করি, মনে হয়—অন্ধকার আর কুয়াশার ভেতর থেকে সেই অস্বাভাবিক লম্বা মানুষটা এখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আসলেই মানুষ ছিল, নাকি অন্য কিছু—তার উত্তর আমি কোনোদিন পেলাম না। শুধু এতটুকু জানি, কুড়িগ্রামের সেই মসজিদের আশেপাশে আজও ভোরবেলায় অনেকেই অদ্ভুত এক লম্বা মানুষের ছায়া দেখতে পান…see moer