আমাদের নতুন জীবনটা শুরু হয়েছিল ঢাকা পলিটেকনিকের লতিফ ছাত্রাবাস থেকে। পুরোনো ইটের তৈরি বিশাল দালান। দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা আর জানালার পাশে ঝুলে থাকা লতাপাতা দেখে মনে হচ্ছিল, শত বছর ধরে এই জায়গাটার বয়স বাড়েনি, শুধু থমকে আছে। আমার রুম নম্বর ২০৩। ভেতরে ঢুকেই একটা পুরোনো, বদ্ধ গন্ধ নাকে এসে লাগল। কেমন যেন বিষণ্ণ একটা ভাব।


আমার রুমমেট রায়হান। পুরোনো ছাত্র, তাই ছাত্রাবাসের সব খুঁটিনাটি তার নখদর্পণে। প্রথম রাতেই লক্ষ্য করলাম, অন্য কোনো ছাত্র আমাদের রুমের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কেমন যেন দ্রুত পা চালায়। একটা চাপা ভয় যেন সবার চোখেমুখে লেপ্টে আছে। আমি ব্যাপারটা রায়হানকে জিজ্ঞেস করলাম। প্রথমে সে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আমার কৌতূহল দেখে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলল আসল কথাটা।

"রাজ, আমাদের এই রুমটায় একটা রহস্য আছে।"

আমি হাসলাম। "রহস্য? কীসের রহস্য? ভূত-প্রেত নাকি?"


রায়হান আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো রসিকতা ছিল না। "আগে একজন ছিল এই রুমে। তার নাম শুভ। সে ছিল খুব মেধাবী, কিন্তু একা থাকতে ভালোবাসত। বছর পনেরো আগের কথা। এক রাতে তার রুম থেকে একটা অদ্ভুত আর্তনাদ শোনা যায়। ছাত্ররা ছুটে এসে দেখে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অনেক কষ্টে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা দেখে, শুভ মেঝেতে পড়ে আছে। তার মুখটা ভয়ে বিকৃত হয়ে আছে, যেন সে এমন কিছু দেখেছে যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। তার শরীর ছিল হিমশীতল, যেন বরফে জমে গেছে।"


শুভর মৃত্যুর কারণ নাকি ছিল হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু রায়হান বলল, ছাত্রাবাসের কেউ এই কথা বিশ্বাস করেনি। সবাই জানত, এটা স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না। এরপর থেকেই এই রুমটাকে সবাই এড়িয়ে চলে। প্রথম কয়েক রাত আমি কিছুই টের পাইনি। রায়হান হয়তো বাড়িয়ে বলেছে, এই ভেবে আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম। কিন্তু আমার সেই নিশ্চিন্ততা বেশিদিন টেকেনি। এক রাতের ঘটনা। আমি পড়ার টেবিলে বসে আছি। হঠাৎ রুমের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেল। একটা হিম শীতল অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরল। আমি ঘড়ি দেখলাম, রাত দুটো বাজে। রায়হান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি উঠে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালালাম। তখনই আমি শুনতে পেলাম একটা ফিসফিসানি। মনে হলো, কেউ যেন আমার কানের কাছে বলছে, "আমি ঠান্ডা... খুব ঠান্ডা... আমার রক্ত জমাট বেঁধে আসছে..."


আমি ভয়ে জমে গেলাম। পুরো শরীর আমার কাঁপছে। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা নিচের দিকে নামাতেই দেখলাম, মেঝেতে কিছু একটা চিকচিক করছে। কাছে গিয়ে দেখি, সেটা লাল রঙের একটা তরল। কেমন যেন পচা গন্ধ আসছে। আমার হাত-পা অবশ হয়ে এলো। এক অজানা আতঙ্কে আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমার চিৎকারে রায়হানের ঘুম ভেঙে গেল। সে উঠে আমাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু আমার মন থেকে সেই দৃশ্যটা কিছুতেই যাচ্ছিল না। পরের কয়েকটা রাত ছিল আরও ভয়ংকর। প্রতিদিন গভীর রাতে রুমের তাপমাত্রা নেমে যায়, আর আমি শুনতে পাই সেই ফিসফিসানি। কখনো দরজায় মৃদু টোকা পড়ে, কখনো বা জানালার কাচে অদ্ভুত আঁচড়ের শব্দ হয়। রাতের বেলা মনে হয়, কেউ যেন নিঃশব্দে আমার বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারলাম, আমার কাছে লুকানোর মতো আর কিছু নেই। লতিফ ছাত্রাবাসের ২০৩ নম্বর রুমের অভিশাপ আমাকে জাপটে ধরেছে।


আমরা দুজন মিলে এই রহস্যের গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কলেজের পুরোনো ফাইলপত্র ঘেঁটে জানতে পারলাম, শুভর পরিবার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। সে একজন এতিম ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার রুম থেকে একটা পুরোনো চিঠি পাওয়া গিয়েছিল, যা রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়। আমরা ২০৩ নম্বর রুমের ভেতরে সেই চিঠিটা খোঁজার চেষ্টা করলাম। খাটের নিচে, টেবিলের ড্রয়ারে, বইয়ের তাক—সব জায়গায় খুঁজলাম। শেষ পর্যন্ত একটি পুরোনো বইয়ের ভেতর থেকে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরা পেলাম। অস্পষ্ট অক্ষরে সেখানে কিছু কথা লেখা আছে। কাগজটা পড়ে আমার রক্ত ঠান্ডা হয়ে এলো। সেখানে লেখা ছিল, "আমি জানি না কেন আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে... আমার রক্ত জমাট বাঁধছে... সে বলেছিল এই ওষুধ আমাকে অমর করবে... কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে মিথ্যা বলেছিল... এই লতিফ ছাত্রাবাসই আমার শেষ ঠিকানা... আমি মারা গেলে আমার এই অভিশপ্ত আত্মা এখানেই থাকবে... যে এই রহস্য জানবে, তার রক্তও জমাট বেঁধে যাবে..."


আমি আর রায়হান দুজনেই কাঁপতে লাগলাম। হঠাৎ রুমের তাপমাত্রা আবারও অস্বাভাবিকভাবে নেমে গেল। আমি অনুভব করলাম, আমার পায়ের নিচের মেঝেটা বরফের মতো শীতল হয়ে যাচ্ছে। রায়হানকে দেখলাম, সেও একইভাবে জমে যাচ্ছে। আমরা দুজনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমাদের পা দুটো ধীরে ধীরে সাদা হয়ে আসছে। আমাদের সামনে সেই অভিশপ্ত দৃশ্যটা ভেসে উঠল। শুভ, তার বিকৃত মুখ, এবং তার জমাট বাঁধা চোখ। সে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা বুঝতে পারলাম, আমরাও সেই অভিশপ্ত মৃত্যুর শিকার হতে চলেছি। 


আমাদের পা সাদা হতে শুরু করেছে, পায়ের তলার মেঝেটা যেন জমে যাওয়া বরফের মতো। রায়হান ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। আমি তার হাতটা ধরলাম, দেখলাম তার হাতও ক্রমশ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। মাথার মধ্যে একটা তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো, যেন আমার মগজের শিরা-উপশিরাগুলো কেউ চেপে ধরছে। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে এটা আমাদের সাথে সত্যি ঘটছে।


হঠাৎ করেই ফিসফিসানিটা আবার শোনা গেল, "তোমরাও জানলে... তোমরাও দেখলে... এখন তোমরাও অনুভব করবে...।"


কণ্ঠটা যেন রুমের প্রতিটি দেয়াল থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল, কিন্তু মাথার ভেতরের যন্ত্রণাটা যেন আগুনের মতো জ্বলছিল। আমার মনে হলো, শুভ শুধু আমাদের রক্ত জমাট বাঁধিয়েই শান্ত হবে না, সে আমাদের মনের সব অনুভূতিও কেড়ে নিতে চাইছে। রায়হানের অবস্থা দেখে আমার মনে হলো, তাকে জাগিয়ে রাখা দরকার। আমি তার হাতটা ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললাম, "রায়হান, চোখ খোল! আমাদের কিছু একটা করতে হবে!" সে কোনোমতে চোখ খুলল, তার চোখগুলোও যেন কাঁচের মতো নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছিল।


সে শুধু অস্পষ্ট স্বরে বলল, "রাজ... আমি... আমি আর পারছি না...।"


ঠিক তখনই একটি বিকৃত ছায়া আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। সেটা ছিল শুভ'র অবয়ব, কিন্তু তার চেহারা ছিল বীভৎস। তার চোখ দুটো যেন গর্তের ভেতর জ্বলছে, আর তার মুখে একটি পৈশাচিক হাসি লেগে আছে। সে তার ঠান্ডা হাতটা আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিল। আমার শরীর তখন এতটাই ঠান্ডা যে কোনো প্রতিরোধ করার শক্তি পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল, শরীরের প্রতিটি কোষ জমাট বেঁধে যাচ্ছে। ঠিক তখনই একটি পুরোনো মন্ত্রের মতো একটি কথা আমার মাথায় খেলে গেল। ছোটবেলায় দাদীর কাছে শোনা একটা কথা, "মৃত্যুকে ভয় পেলে মৃত্যু আসে, কিন্তু মৃত্যুকে উপেক্ষা করলে জীবন নতুন পথ দেখায়।" এই কথাটা কেন জানি আমার মনে হলো এটাই এখন একমাত্র উপায়। আমি চিৎকার করে বললাম, "আমরা তোমাকে ভয় পাই না, শুভ! আমরা তোমার অভিশাপকে ভয় পাই না!"



আমার কথা শুনে শুভ'র অবয়বটা একটু কেঁপে উঠল। তার পৈশাচিক হাসিটা যেন মিলিয়ে যেতে শুরু করল। রায়হানও আমার কথা শুনে কিছুটা শক্তি পেল। সেও চিৎকার করে বলল, "হ্যাঁ! আমরা ভয় পাই না!"


আমরা দু'জনই একযোগে চিৎকার করতে শুরু করলাম। আমাদের চিৎকার যেন রুমের শীতলতাকে ভেদ করে যাচ্ছিল। শুভ'র অবয়বটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করল। তার চোখের জ্বলন্ত আলো নিভে গেল। রুমের তাপমাত্রা আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল। আমাদের শরীর আবার গরম হতে শুরু করল। পা দুটোর সাদা রঙও স্বাভাবিক হয়ে এল। আমরা দু'জন মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লাম, ভয়ে আর ক্লান্তি দুটোই যেন আমাদের শরীরকে অবশ করে দিয়েছে।

আমরা নিজেদের দিকে তাকালাম, দু'জনেই হাঁফাচ্ছি। রায়হান বলল, "আমরা... আমরা বেঁচে আছি?"


আমি শুধু মাথা নাড়লাম। আমরা হয়তো বেঁচে আছি, কিন্তু এই রাতের ঘটনা আমাদের মনে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেল। আমাদের হয়তো ২০৩ নম্বর রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত, কিন্তু আমরা জানি এই রহস্যের শেষ না দেখে আমরা শান্ত হতে পারব না। শুভ'র অভিশাপ হয়তো আমাদের ছেড়ে গেছে, কিন্তু এর পেছনের কারণটা এখনও অজানা। সেই অজানা কারণই হয়তো আমাদের আবার এই রহস্যের গভীরে টেনে নিয়ে যাবে। আমাদের চিৎকারে শুভ'র অভিশাপ হয়তো সাময়িকভাবে পিছু হটেছিল, কিন্তু ২০৩ নম্বর রুমের রহস্য আরও গভীরে প্রোথিত ছিল। আমরা দু'জনই জানি, এই লড়াই শেষ হয়নি। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, শুভ'র চিঠিতে লেখা 'সেই লোক'-এর পরিচয় খুঁজে বের করতে হবে, যে তাকে এই অভিশপ্ত ওষুধ দিয়েছিল। পরের দিন লাইব্রেরিতে গিয়ে পুরোনো কলেজের নথি খুঁজতে শুরু করলাম।


হঠাৎ করেই একটা পুরোনো ফটোগ্রাফি বইয়ের ভেতর আমাদের চোখ আটকে গেল। বইটা ছিল ১৫ বছর আগের 'ইনডোর স্পোর্টস মিট'-এর। ছবির ভিড়ের মধ্যে একটা পরিচিত মুখ আমাদের নজর কাড়ল—কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন। অবাক করার বিষয় হলো, ছবির নিচে একটি ছোট ক্যাপশন লেখা ছিল, "ড. মোশাররফ হোসেন তার নতুন গবেষণামূলক কাজের জন্য ছাত্রদের সহায়তা খুঁজছেন।"


এই ক্যাপশনের পাশে একটা অদ্ভুত প্রতীক আঁকা ছিল, যা দেখতে ঠিক শুভ'র চিঠিতে পাওয়া প্রতীকের মতোই। রায়হান ফিসফিস করে বলল, "শুভ তো রসায়নের ছাত্র ছিল না, তাহলে ড. মোশাররফ কীভাবে তার সাথে যুক্ত?"


আমরা দু'জনেই একটা শীতল অনুভূতি অনুভব করলাম। আমাদের মনে হলো, এই রহস্যের জট শুভ'র মৃত্যুর চেয়েও বড়। আমরা জানতে পারলাম, ড. মোশাররফ কলেজের ল্যাবের পেছনে একটি ছোট গোপন ল্যাব চালাতেন, যা অন্য কোনো অধ্যাপক বা ছাত্র জানত না। শোনা যায়, তিনি নাকি 'অমরত্বের ওষুধ' নিয়ে গবেষণা করছিলেন। কিন্তু এক রাতে তার ল্যাব থেকে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং এরপর থেকেই তিনি গায়েব হয়ে যান। কলেজের পুরোনো নথিতে তার কোনো ঠিকানা বা পারিবারিক তথ্য পাওয়া গেল না।


রাত গভীর হতে শুরু করেছে। ২০৩ নম্বর রুমে ফিরতেই অদ্ভুত একটা ঠান্ডা অনুভূতি আবার আমাদের ঘিরে ধরল। এবার আর কোনো ফিসফিসানি নেই। শুধু একটা মৃদু গুনগুন শব্দ। মনে হলো, কেউ যেন মন্ত্র পড়ছে। আমরা সাবধানে রুমের প্রতিটি কোনা পরীক্ষা করতে শুরু করলাম। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল আয়নার উপর। আয়নার উপর অস্পষ্টভাবে কিছু লেখা ভেসে উঠছে। অক্ষরগুলো এত ছোট যে পড়া কঠিন। কিন্তু ভালো করে তাকাতেই আমরা দেখতে পেলাম, লেখাটা আসলে শুভ'র হাতের লেখা। সেখানে লেখা ছিল, "সে মিথ্যা বলেছিল... সে আমার শরীরকে অমরত্ব নয়, শুধু জমাট বাঁধাতে চেয়েছিল..."।


আয়নার লেখাটা পড়তে না পড়তেই সেটা মিলিয়ে গেল। কিন্তু আয়নার ভেতর আমরা একটি বিকৃত মুখ দেখতে পেলাম। সেটা শুভ নয়, সেটা ড. মোশাররফ হোসেনের মুখ! তার চোখে একটি উন্মাদ হাসি। আয়নার ভেতর থেকে তার মুখটা আমাদের দিকে ঝুঁকে এলো। তিনি চিৎকার করে বললেন, "আমি মিথ্যে বলিনি! অমরত্ব কেবল মৃত্যুর মাধ্যমে পাওয়া যায়! আর তোমরাই হবে তার পরবর্তী শিকার!"


হঠাৎ করেই রুমের সব আলো নিভে গেল। আমরা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। রায়হান তার মোবাইল বের করে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সেটা কাজ করল না। চারিদিকে তখন একটি শীতল, ভুতুড়ে হাসি শোনা যাচ্ছে। সেই হাসির শব্দে দেয়ালগুলো কাঁপছে। আমরা দু'জনই অনুভব করলাম, আমাদের পায়ের তলায় মেঝে আবার বরফের মতো শীতল হতে শুরু করেছে। এবার আর কোনো ফিসফিসানি নয়, এবার ড. মোশাররফ হোসেনের আত্মা আমাদের সামনে। সে হয়তো শুভ'কে ব্যবহার করে তার গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে সে বলল, "তোমরা আমার সব গোপন তথ্য জেনে গেছ। এখন তোমাদেরও আমার গবেষণার অংশ হতে হবে।"


আমরা দু'জনই ভয়ে জমে গেলাম। ড. মোশাররফের আত্মা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, তার হাতে একটা কাঁচের শিশি। শিশির ভেতরে নীল রঙের তরল কিছু চিকচিক করছে। আমরা জানি, এটাই সেই অভিশপ্ত ওষুধ। তারপর ড. মোশাররফের আত্মা আমাদের দিকে সেই নীল তরলভরা শিশি নিয়ে এগিয়ে আসছে। তার চোখের উন্মত্ততা দেখে আমার মনে হলো, তিনি শুধু আমাদের রক্ত জমাট বাঁধিয়েই থামবেন না, তিনি আমাদের আত্মাকেও বন্দি করে রাখবেন। রায়হান ভয়ে জমে গেছে, তার পা দুটো আর চলছে না। আমি তাকে ধরে বললাম, "দৌড়া, রায়হান!"


আমরা দু'জনই একযোগে পেছনের দিকে দৌড় দিলাম। কিন্তু রুমের মধ্যে যেন কোনো অদৃশ্য দেয়াল আমাদের পথ আটকে দিচ্ছে। যতই দৌড়াচ্ছি, ততই মনে হচ্ছে আমরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। ড. মোশাররফের আত্মা আমাদের খুব কাছাকাছি চলে এলো। তার শিশি থেকে এক ফোঁটা নীল তরল মেঝেতে পড়তেই মেঝেটা ফসিলের মতো শক্ত হয়ে গেল। আমরা বুঝতে পারলাম, তার উদ্দেশ্য কী। হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। শুভর চিঠিতে লেখা ছিল, 'সে বলেছিল এই ওষুধ আমাকে অমর করবে... কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে মিথ্যা বলেছিল... এই লতিফ ছাত্রাবাসই আমার শেষ ঠিকানা...'।


এই কথাটা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট, ড. মোশাররফের ওষুধ অমরত্ব দেয় না, বরং জমাট বাঁধানোর মাধ্যমে আত্মাকে আটকে রাখে। হয়তো এর প্রতিষেধকও এই রুমের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

আমি চিৎকার করে বললাম, "রায়হান, ওই চিঠিটা কোথায় রেখেছি মনে আছে?"


রায়হান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "পুরোনো বইটার ভেতর!"


আমি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না। ড. মোশাররফের আত্মা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই আমি পড়ার টেবিলের দিকে ছুটে গেলাম। পুরোনো বইটা হাতে নিয়ে আমি frantically পাতা ওল্টাতে লাগলাম। ওদিকে রায়হানকে দেখলাম, সে এক পাশে সরে গিয়ে কোনোমতে ড. মোশাররফের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আমি দেখলাম, বইয়ের শেষ পাতায় একটা ছোট হাতের লেখা। সেখানে লেখা আছে, "আলোই একমাত্র পথ।"


আমি চিৎকার করে বললাম, "রায়হান, লাইট জ্বালা!"


রায়হান তার পকেট থেকে এক কৌটা দেশলাই বের করল। হাতের কাঁপনি সত্ত্বেও সে কোনোমতে একটা কাঠি জ্বালাতে সক্ষম হলো। দেশলাইয়ের সামান্য আলোয় রুমের অন্ধকার কিছুটা দূর হলো। আর ঠিক তখনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ড. মোশাররফের আত্মা সেই আলোর স্পর্শে যেন পুড়ে যেতে শুরু করল। তার বীভৎস মুখটা বিকৃত হয়ে গেল, আর তিনি চিৎকার করে বললেন, "না! আলো নয়! আমি অন্ধকারেই অমর!"


রায়হান সঙ্গে সঙ্গে আরো দুটো দেশলাই কাঠি জ্বালাল। রুমের অন্ধকার যেন সেই সামান্য আলোতেই মিলিয়ে যাচ্ছিল। ড. মোশাররফের আত্মা তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে দূরে সরে গেল, আর তার হাত থেকে সেই নীল তরলভরা শিশিটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। শিশি ভাঙতেই এক ধরনের কালো ধোঁয়া রুমের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল, আর তার মধ্যে থেকে শত শত বিকৃত মুখ আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করল। তারা যেন ড. মোশাররফের অতীতে শিকার হওয়া অন্যান্য আত্মা। তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, তাদের মুখে একই উন্মাদ হাসি। আমরা এবার কী করব বুঝে উঠতে পারলাম না। হঠাৎ আমাদের পেছনের দেয়াল থেকে একটা করুণ ফিসফিসানি শোনা গেল, "আমি এখানে... আমাকে বের করো... আমি তোমাদের পথ দেখাব..."।


আমরা দু'জনই ঘুরে তাকালাম। দেয়ালের একটি কোণে একটি ছোট ফাটল দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে শুভ'র আত্মা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। তার মুখটা এবার আর বিকৃত নয়, বরং সেখানে একধরনের বিষণ্ণতা। সে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত ইশারা করে ফাটলটার দিকে ইঙ্গিত করল। আমরা বুঝতে পারলাম, এই ফাটলের পেছনেই হয়তো সব রহস্যের সমাধান লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমরা যদি ফাটলের দিকে এগিয়ে যাই, তাহলে হয়তো ড. মোশাররফের শিকার হওয়া বাকি আত্মাগুলো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর যদি না যাই, তাহলে হয়তো এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাব না। আমরা এক অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে আটকে পড়লাম।



আমরা দু'জনই দেয়ালের ফাটল আর সামনে এগিয়ে আসা বিকৃত আত্মাগুলোর মাঝে আটকে পড়লাম। এক অজানা আতঙ্কে আমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। এমন সময় শুভ’র আত্মা ফিসফিস করে বলল, "দ্রুত! এই ফাটল দিয়ে ভেতরে যাও!" তার কণ্ঠস্বরে কোনো ছলনা ছিল না। রায়হান আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "শুভ আমাদের সাহায্য করতে চাইছে।"


আমরা আর দেরি করলাম না। রায়হান এক লাফে ফাটলের দিকে ছুটে গেল, আমি তাকে অনুসরণ করলাম। বিকৃত আত্মাগুলো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই আমরা ফাটলের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ফাটলের অন্যপাশে একটি ছোট, অন্ধকার গুহার মতো জায়গা। সেখানে ড. মোশাররফের পুরোনো ল্যাবরেটরি। চারপাশে পুরোনো যন্ত্রপাতি আর রাসায়নিক পদার্থের বোতল ছড়িয়ে আছে। আমরা বুঝতে পারলাম, এটাই ছিল তার গোপন ল্যাব। হঠাৎই আমরা দেখতে পেলাম, ল্যাবের মাঝখানে একটি টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ডায়েরি পড়ে আছে। তার উপরেই জ্বলন্ত অবস্থায় শুভর আত্মা ভাসছে। সে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, "এই ডায়েরিতেই সব রহস্যের সমাধান আছে। তোমরা এটা নিয়ে এখান থেকে যাও।"


আমরা দ্রুত ডায়েরিটা হাতে নিলাম। ডায়েরিটা হাতে নিতেই শুভর আত্মা একটি উজ্জ্বল আলোয় পরিণত হয়ে সেই ল্যাবের অন্ধকার গুহার মধ্যে মিলিয়ে গেল। ডায়েরিটা হাতে আসতেই আমাদের পায়ের তলার মেঝে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। আমরা বুঝতে পারলাম, শুভর আত্মাও মুক্তি পেয়েছে। ল্যাব থেকে বের হয়ে আমরা সোজা আমাদের রুম ২০৩-এর দিকে তাকালাম। দরজাটা খোলা, আর রুমের ভেতরে একটা শান্ত, স্নিগ্ধ আলো জ্বলছে। দেয়ালের শ্যাওলা আর স্যাঁতসেঁতে ভাব যেন এক নিমিষেই দূর হয়ে গেছে। আমরা রুমে ঢুকতেই লক্ষ্য করলাম, রুমের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি আরামদায়ক। পুরোনো, বদ্ধ গন্ধের বদলে একটা তাজা ফুলের ঘ্রাণ নাকে এলো।


পরের দিন সকালে আমরা ডায়েরিটা নিয়ে বসলাম। সেখানে ড. মোশাররফের নিজের হাতে লেখা সমস্ত বিবরণ ছিল। তিনি লিখেছিলেন যে তিনি অমরত্বের ওষুধ আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার গবেষণায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে অমরত্ব কেবল মৃত্যুর মাধ্যমেই পাওয়া যায়। তাই তিনি এমন একটি রাসায়নিক তরল আবিষ্কার করেন, যা মানব শরীরকে জমাট করে আত্মাকে সেই দেহের মধ্যে আটকে রাখে। আর সেই আত্মা তখন অন্য কারো মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে তার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়। শুভ ছিল তার প্রথম সফল পরীক্ষা। ড. মোশাররফ চেয়েছিলেন শুভ’র আত্মাকে নিজের মধ্যে স্থানান্তরিত করে অমর হতে। কিন্তু শুভ’র মৃত্যুর পর তার আত্মা এত শক্তিশালী হয়ে যায় যে ড. মোশাররফ তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। এর ফলে শুভ’র আত্মা ড. মোশাররফের ওপর প্রতিশোধ নেয় এবং তাকেও তার মতোই জমাট বেঁধে দেয়।


ডায়েরির শেষ পাতায় তিনি লিখেছিলেন, "যে এই ডায়েরিটা খুঁজে পাবে, সে আমার সব জ্ঞান পাবে। কিন্তু বিনিময়ে তাকে ২০৩ নম্বর রুমে এসে এই ল্যাবের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে আমার আত্মাকে মুক্ত করতে হবে। তবেই তার জীবন অভিশাপমুক্ত হবে।"


আমরা জানতাম আমাদের কী করতে হবে। লতিফ ছাত্রাবাসের ২০৩ নম্বর রুম আর অভিশপ্ত রইল না। কারণ শুভ’র আত্মা মুক্তি পেয়েছে। আর আমরা সেই ডায়েরি ব্যবহার করে ল্যাবে ফিরে গেলাম। ডায়েরিতে লেখা পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা ড. মোশাররফের আত্মাকেও মুক্তি দিলাম। আজ আর ২০৩ নম্বর রুমের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে কেউ ভয় পায় না। আমাদের কলেজের পুরোনো ছাত্রাবাস এখন একটি নতুন জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে পুরোনো রহস্যের বদলে শুধু নতুন স্মৃতি তৈরি হয়। আমরা আর ভয় পাই না। কারণ আমরা জানি, কিছু অভিশাপ হয়তো ভয়ের মতো মনে হয়, কিন্তু সত্য এবং সাহসের আলোয় সেগুলোকে জয় করা যায়।...see moer