_শিহাব ও জান্নাতের গল্প 💑
শহরে টানা তিনদিন রোদের পর হঠাৎ সন্ধ্যায় আকাশ কালো হয়ে এলো। গরমে অতিষ্ঠ মানুষগুলো যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।শিহাব অফিস থেকে বের হয়েই দেখল টিপটিপ করে বৃষ্টি নামছে। ব্যাগ হাতড়ে দেখল ছাতা নেই। আজ সকালে তাড়াহুড়োয় ফেলে এসেছে। অগত্যা রাস্তার পাশের "চাচার চায়ের দোকান" এর শেডের নিচে দাঁড়াল।
বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পানির ফোঁটা গুলো চিকচিক করছে। ঠিক তখনই ভিজতে ভিজতে দৌড়ে এলো জান্নাত। হাতে একটা হলুদ ছাতা, সাদা কামিজটা হাঁটু পর্যন্ত ভিজে গেছে, চুল থেকে পানি টপটপ পড়ছে। মুখে হাসি কিন্তু নিঃশ্বাস নিচ্ছে জোরে। শিহাব চমকে উঠল। এটা তো ওর ভার্সিটির জুনিয়র জান্নাত। ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট। দুই বছর পর দেখা। শেষবার দেখেছিল কনভোকেশনে।
"তুমি এখানে?" শিহাব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
জান্নাত হেসে বলল, "বৃষ্টি দেখে মনে হলো একটু ভিজি। অফিস থেকে সোজা বাসায় যাচ্ছিলাম। আর তুমি ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে কেন? ভিজে যাবা তো"
"ছাতা ভুলে গেছি। অফিসেই আছে" জান্নাত ছাতাটা একটু বড় করে ধরে বলল, "আসো, দুজনেই ভিজব না। কাছে আসো।" প্রথমে ইতস্তত করলেও শিহাব শেষে ছাতার নিচে ঢুকল। দুজনের কাঁধ প্রায় ছুঁই ছুঁই। দুজন পাশাপাশি হাঁটছে। রাস্তায় পানি জমে গেছে। জান্নাত মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে পানিতে পা ফেলছে, ছপাৎ করে শব্দ হচ্ছে।
শিহাব বারণ করছে, "পা ভিজে যাবে তো। জ্বর আসবে" জান্নাত খিলখিল করে হেসে বলল, "বৃষ্টির দিনে পা না ভিজালে বৃষ্টিবিলাস হয় নাকি? আপনি তো ভার্সিটিতেও এমন বকতেন।"
শব্দটা শুনে শিহাবের বুকের ভেতর মোচড় দিল। "বৃষ্টিবিলাস" - ওদের ভার্সিটির গ্রুপের নাম ছিল এটা।
একটা চায়ের দোকানে বসে দুই কাপ দুধ-চা আর গরম পাকোড়া। বৃষ্টির জন্য দোকান ফাঁকা। জান্নাত চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, "মনে আছে শিহাব ভাই, ভার্সিটিতে বৃষ্টি হলেই আপনি ছাদে গিয়ে গিটার বাজাতেন? 'পথের ধুলোয়' গানটা?" শিহাব লজ্জা পেয়ে বলল, "তুমি মনে রেখেছ? আমি তো ভাবছি সবাই ভুলে গেছে"
"হুম। আর মনে আছে আপনি একদিন বলেছিলেন, বৃষ্টিতে যার হাত ধরার মানুষ থাকে তার জীবন সুন্দর হয়ে যায়?" শিহাব চুপ করে গেল। বৃষ্টির শব্দের মধ্যে জান্নাতের কথাটা কেমন যেন বুকের ভেতর বাজল। হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। চারপাশ অন্ধকার। শুধু দোকানের একটা মোমবাতি আর বাইরে বৃষ্টির আলো।
জান্নাত একটু ভয় পেয়ে শিহাবের দিকে সরে বসল। শিহাব আস্তে করে বলল, "ভয় পেও না, আমি আছি তো।" সেই "আমি আছি তো" কথাটার মধ্যে জান্নাত কেমন একটা নিরাপত্তা খুঁজে পেল। অনেক দিন পর কেউ এমন করে বলল। বৃষ্টি কমে এলে দুজন আবার হাঁটা শুরু করল। জান্নাতের বাসা কাছেই, ২ গলি পরে।
গেটের সামনে এসে জান্নাত ছাতাটা শিহাবের দিকে বাড়িয়ে দিল। "এটা রাখো। কাল অফিসে দিয়ে দিও" শিহাব বলল, "কাল দেখা করবে? ছাতা ফেরত দিতে?" জান্নাত হেসে মাথা নাড়ল, "বৃষ্টি হলে। কারণ বৃষ্টিবিলাস একা ভালো লাগে না।" সেই রাতের পর থেকে শহরে বৃষ্টি হলেই শিহাবের ফোনে মেসেজ আসে, "বৃষ্টি নেমেছে। ছাতা নিয়ে আসো।"
আর শিহাবও এখন ছাতা ছাড়া বের হয় না। কারণ সে জানে, বৃষ্টিভেজা শহরে কেউ একজন তার জন্য হলুদ ছাতা নিয়ে অপেক্ষা করছে। সেইদিনের পর থেকে প্রায় এক মাস কেটে গেছে। বৃষ্টি নেই। খটখটে রোদ। শিহাব রোজ আকাশ দেখে। হলুদ ছাতাটা ওর ঘরের এক কোণে রাখা। মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দেখে, জান্নাতের হাতের গন্ধটা যেন এখনো লেগে আছে। মাঝে ২-৩ বার কথা হয়েছে, কিন্তু দেখা হয়নি। আজ হঠাৎ দুপুরে আকাশ মেঘলা। অফিসে বসেই শিহাবের ফোনে টুং করে মেসেজ -
*জান্নাত*: বৃষ্টি আসছে। ছাতা নিয়ে ক্যাম্পাসের গেটে আসো। মিস করছি। শিহাব দৌড়ে গেল। বসের বকা খাওয়ার রিস্ক নিয়েও। জান্নাত আগে থেকেই দাঁড়িয়ে। আজ ওর গায়ে নীল জামা, হাতে সেই হলুদ ছাতা। চুলে বেনী।
"দেরি করলা কেন?" জান্নাত অভিমানী গলায় বলল। "আমি আধা ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে"
"তোমার মেসেজ পেয়ে উড়ে আসছি" শিহাব হাসল। "সরি, ট্রাফিক ছিল" দুজন ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে হাঁটছে। বৃষ্টি টিপটিপ করে নামছে। পুরো ক্যাম্পাস ফাঁকা। সেই পুরনো বটগাছ, সেই লাইব্রেরি, সবকিছু চেনা। জান্নাত হঠাৎ বলল, "শিহাব ভাই, একটা কথা বলব?"
"বলো"
"আপনি কি শুধু বৃষ্টির দিনেই আমার সাথে দেখা করবেন? রোদের দিনে কি আমাকে মনে পড়ে না?" শিহাব থেমে গেল। ছাতাটা দুজনের মাথার উপর ভালো করে ধরল। বৃষ্টির ফোঁটা ছাতায় পড়ে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। "না। আমি চাই রোদ, বৃষ্টি, ঝড় - সব দিনেই তুমি পাশে থাকো। শুধু ছাতাটা যেন দুজনের জন্য একটাই হয়। বুঝছো?" জান্নাত লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকাল। ওর গাল লাল হয়ে গেছে। "তাহলে কথা দেন, আর কখনো ছাতা ভুলবেন না"
"কথা দিলাম" শিহাব বলল, "আর তুমিও কথা দাও, আর কখনো একা ভিজবে না। একা কষ্ট পাবে না।" বৃষ্টি তখন জোরে নামছে। ওরা একটা পুরনো বটগাছের নিচে দাঁড়াল। চারপাশে শুধু পাতার শব্দ আর বৃষ্টি। জান্নাত আস্তে করে বলল, "আমার না বৃষ্টির দিনে চা আর পাকোড়া খেতে খুব ইচ্ছা করে। আম্মু বানায় না আজকাল" শিহাব হেসে বলল, "চলো, আমার বাসায়। আম্মু দারুণ পাকোড়া বানায়। আর গল্পও করবে তোমার সাথে"
দুজন ভিজতে ভিজতেই রিকশা নিল। রিকশার হুডে বৃষ্টির পানি পড়ার টপটপ শব্দ। জান্নাত শিহাবের কাঁধে মাথা রাখল। শিহাব কিছু বলল না, শুধু ছাতাটা আরেকটু ওর দিকে ঘুরিয়ে দিল। বাসায় গিয়ে আম্মু ওদের দেখে কিছুই বলল না। শুধু গরম গরম পাকোড়া আর আদা-চা দিল। জান্নাত চা খেতে খেতে বলল, "আন্টি, আপনার ছেলে কিন্তু খুব ভালো। ভার্সিটিতেও হেল্প করত"
আম্মু হেসে বলল, "জানি মা। বৃষ্টির দিনে যে ছেলে মেয়ের জন্য ছাতা নিয়ে দৌড়ায়, সে ছেলে খারাপ হতে পারে না। তুমি মাঝে মাঝে আসবা" সন্ধ্যায় বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশে হালকা রোদ উঠেছে। রাস্তায় ভেজা গন্ধ।
বিদায়ের সময় জান্নাত বলল, "আবার কবে বৃষ্টি হবে?" শিহাব বলল, "বৃষ্টি না হলেও আমি আসব। কারণ আমার বৃষ্টিবিলাসের মানুষটাকে আমি রোজ দেখতে চাই।" জান্নাত চলে যাওয়ার পর শিহাব ছাতাটার দিকে তাকিয়ে হাসল। এই হলুদ ছাতার ভেতর এখন দুজনের গল্প লেখা আছে।
৩ বছর পর।
আজ শিহাব আর জান্নাতের বিয়ে। সকাল থেকে রোদ ঝলমল করছে। সবাই বলছে "কপাল ভালো, বৃষ্টি হয়নি"। বিয়ের দিন বৃষ্টি অশুভ। কিন্তু শিহাবের মন খারাপ। কারণ ওদের গল্পটা তো বৃষ্টি দিয়েই শুরু। হলুদ ছাতা, চায়ের দোকান, ভেজা রাস্তা - সব। বিকেল ৪টা। বরযাত্রী নিয়ে শিহাব যখন জান্নাতের বাড়ির সামনে পৌঁছাল, আকাশ হঠাৎ কালো। মেঘ ডাকছে।
ঠিক ৪টা ১০ এ কাজী সাহেব কবুল বলানোর সময় টিনের চালে টাপুর টুপুর বৃষ্টি। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে। জান্নাত লাল বেনারসিতে বসে আছে। মুখে ঘোমটা। বৃষ্টির শব্দে ওর বুক ধুকপুক করছে। ও জানে শিহাব খুশি হবে। কবুল বলার পর শিহাব আস্তে করে বলল, "দেখছো? আল্লাহও চায় আমাদের গল্পটা বৃষ্টিতেই পূর্ণ হোক। প্রথম দিন যেমন ছিলে, আজও তেমন" বিয়ে শেষে বিদায়ের সময় মুশলধারে বৃষ্টি। গাড়ি আসতে দেরি।
জান্নাতের আব্বু শিহাবের হাতে জান্নাতের হাত তুলে দিয়ে বলল, "বাবা, আমার মেয়েটাকে আগলে রেখো। যেমন বৃষ্টির দিনে ছাতা দিয়ে আগলে রাখতে" শিহাব হেসে বলল, "জ্বি আব্বা। এই দায়িত্ব আমি বৃষ্টির দিন থেকেই নিয়ে নিয়েছি। কথা দিচ্ছি" গাড়িতে উঠে জান্নাত শিহাবের কাঁধে মাথা রাখল। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে দুজন। রাস্তায় পানি। জান্নাত ফিসফিস করে বলল, "মনে আছে প্রথম বৃষ্টির দিন তুমি বলেছিলা 'আমি আছি তো'?"
শিহাব ওর হাত শক্ত করে ধরল, "আজীবন থাকব। শুধু বৃষ্টির দিনে না, জীবনের সব দিনে। অসুখে, সুখে, ঝড়ে" বাসায় পৌঁছে দেখে উঠানে পানি জমে গেছে। শিহাব কোলে করে জান্নাতকে ঘরে নিয়ে গেল। সবাই হাসল। ঘরের এক কোণে সেই পুরনো হলুদ ছাতাটা এখনো রাখা। ফ্রেমে বাঁধানো। পাশে লেখা "আমাদের প্রথম ছাতা - ১৮ এপ্রিল"
রাতে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে জান্নাত বলল, "আমাদের প্রথম দেখা, প্রথম কথা, প্রথম হাত ধরা - সব বৃষ্টিতে। আর আজ আমাদের নতুন জীবনেরও প্রথম রাত বৃষ্টিতে" শিহাব জান্নাতের কপালে চুমু দিয়ে বলল, "তাহলে আমাদের নাম দেই 'বৃষ্টিবিলাস'। কারণ তুমি আমার বৃষ্টি, আর আমি তোমার বিলাস। আর এই বৃষ্টি কখনো থামবে না"
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। আর ভেতরে দুটো মানুষ, একটা ছাতা আর একটা গল্প - যা বৃষ্টি দিয়ে শুরু হয়ে সারাজীবন চলবে।

0 Comments