লোকেশন: ব্ল্যাকউড হিল, নর্থ ইয়র্কশায়ার, ইংল্যান্ড
২০১১ সালের শেষ দিকের ঘটনা। ইংল্যান্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ারের এক ছোট্ট পাহাড়ি অঞ্চল ব্ল্যাকউড হিল— মানচিত্রে যার নাম থাকলেও বাস্তবে সেখানে মানুষের বসবাস প্রায় নেই বললেই চলে। বহু বছর আগে কয়েকটি পরিবার এখানে থাকত, কিন্তু একের পর এক অদ্ভুত দুর্ঘটনা, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আর অকারণ অগ্নিকাণ্ডের পর এলাকা প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সেই এলাকার একমাত্র দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো ভিক্টোরিয়ান বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিল “গ্রে হাউস” নামে।
লোকজন বলে, বাড়িটি ১৮৯০ সালের দিকে এক ধনী কাঠ ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড হেনলি তার একমাত্র মেয়ের জন্য বানিয়েছিলেন। মেয়েটির নাম ছিল এলিসা। খুব শান্ত, খুব কম কথা বলা এক মেয়ে। এলাকায় যারা তখন বাস করত, তারা বলত— মেয়েটির চোখে সবসময় এমন এক শূন্যতা ছিল যেন সে আমাদের পৃথিবীর নয়, অন্য কোথাও তাকিয়ে থাকে।
১৯০৩ সালের এক ঝড়ের রাতে হঠাৎ করে এলিসা নিখোঁজ হয়ে যায়। পুরো বাড়ি, বাগান, আশেপাশের বন— কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই ঘটনার পর থেকেই অদ্ভুত সব গুজব ছড়াতে শুরু করে। মাঝরাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাকের একটি ছোট মেয়ের ছায়া কেউ কেউ দেখেছে বলে দাবি করত। কেউ বলত, পুরনো দরজার ভেতর থেকে অনেকগুলো মানুষের ফিসফিস আওয়াজ শোনা যায়।
বছরের পর বছর ধরে বাড়িটি বন্ধই ছিল। কেউ সেখানে থাকতে সাহস করত না। কিন্তু ২০১১ সালে শহরের একজন তরুণ ফটোগ্রাফার, ড্যানিয়েল ক্রস, তার “অ্যাব্যান্ডনড প্লেসেস অফ ব্রিটেন” প্রজেক্টের জন্য সেই বাড়িতে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয়রা তাকে বহুবার নিষেধ করেছিল, কিন্তু সে এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করত না।
ড্যানিয়েল পরে তার ডায়েরিতে লিখেছিল— “বাড়িটিতে ঢোকার মুহূর্তেই একটা অদ্ভুত ঠান্ডা অনুভূতি হচ্ছিল। বাইরে তখন রোদ ছিল, কিন্তু ভেতরে যেন আলো ঢুকতেই চাইছিল না।”
বাড়ির প্রথম করিডোরে ঢুকেই সে দেখে, দেয়ালের রং উঠে গেছে, মেঝেতে ভাঙা কাঠ আর ধুলো জমে আছে। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও একটি বিষয় তাকে অবাক করেছিল— করিডোরের একেবারে শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরনো পুতুল, যেন কেউ ইচ্ছে করে তাকে সেখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। পুতুলটির গায়ে ছিল লম্বা কালো পোশাক, আর মুখে ছিল সাদা পোরসেলিনের মতো ফ্যাকাসে এক অভিব্যক্তি।
ড্যানিয়েল প্রথমে ভেবেছিল হয়তো আগের কোনো ভিজিটর রেখে গেছে। সে কয়েকটি ছবি তুলে নেয়। কিন্তু যখন সে করিডোরের ডানদিকের একটি ঘরের ছবি তুলতে যায়, তখন তার মনে হয় যেন কেউ তাকে তাকিয়ে দেখছে। সে পিছনে তাকায়— পুতুলটি ঠিক আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল তার মাথার কোণ একটু বদলে গেছে।
সে বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে আরও ভেতরে যায়। কয়েক মিনিট পর আবার যখন সে করিডোরে ফিরে আসে, তখন সে দেখে পুতুলটির পাশে দেয়ালে অদ্ভুত কিছু দাগ— যেন ছোট ছোট হাতের ছাপ। আর সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় ছিল— করিডোরের শেষ দরজাটি, যা আগে বন্ধ ছিল, এখন অল্প খোলা।
ড্যানিয়েল তার ক্যামেরা চালু রেখে দরজার কাছে যায়। দরজার ভেতরটা ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকার। সে টর্চ জ্বালাতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয় যেন ভেতরে অনেকগুলো ছোট সাদা মুখ নড়ে উঠল। সে ভেবেছিল হয়তো আলো-ছায়ার খেলা। কিন্তু ঠিক তখনই তার ক্যামেরা হঠাৎ নিজে থেকেই শাটার ক্লিক করে কয়েকটি ছবি তুলে ফেলে।
সে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে শেষবারের মতো করিডোরের দিকে তাকিয়ে সে স্থির হয়ে যায়— পুতুলটি আর আগের জায়গায় নেই। এখন সেটি দাঁড়িয়ে আছে দরজার একেবারে সামনে।
ড্যানিয়েল সেদিন আর ভেতরে যায়নি। বাড়ি ফিরে ছবিগুলো কম্পিউটারে ট্রান্সফার করার সময় সে দেখে একটি ছবিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে— দরজার ভেতরের অন্ধকারে সারি সারি ছোট মুখ, যেগুলো ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়— করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুতুলটির পেছনে খুব হালকা ছায়ার মতো আরেকটি মেয়ের অবয়ব, যার মুখ দেখা যায় না।
সে ছবিগুলো অনলাইনে আপলোড করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছবিগুলো ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই বলেছিল ছবিগুলো এডিট করা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো— যারা পরে বাড়িটিতে গিয়ে একই জায়গায় ছবি তুলেছিল, তাদের ক্যামেরায়ও অদ্ভুত অস্পষ্ট ছায়া ধরা পড়েছিল।
২০১২ সালের শুরুতে স্থানীয় প্রশাসন বাড়িটিকে সম্পূর্ণভাবে সিল করে দেয়। কারণ, কয়েকজন কিশোর রাতে বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে এবং তাদের মধ্যে একজন দাবি করে যে সে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা “একটি জীবন্ত পুতুল” দেখেছে, যেটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছিল। পরে সেই কিশোরকে অস্বাভাবিক আতঙ্কজনিত কারণে কয়েকদিন চিকিৎসার অধীনে রাখা হয়।
সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালে। এলাকার এক নিরাপত্তা কর্মী জানান, রাতে টহল দেওয়ার সময় তিনি বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি ভাঙা জানালায় কালো পোশাক পরা একটি ছোট মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তিনি ভেবেছিলেন কেউ হয়তো ভেতরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখেন পুরো বাড়ির দরজায় তখনও সিল লাগানো, কোনো চিহ্ন নেই ভাঙার।
আজও ব্ল্যাকউড হিলের মানুষরা সূর্য ডোবার পর সেই রাস্তা ব্যবহার করে না। আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে দূর থেকে কখনও কখনও বাড়ির করিডোরের জানালায় একটি লম্বা কালো ছায়া দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়— ঠিক সেই পুতুলটির মতো।
কিছু ইতিহাস গবেষক দাবি করেন, এলিসা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার আগে ওই বাড়িতে কয়েকজন শিশুর রহস্যজনক অসুস্থতার রেকর্ড পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু ঘটনাগুলো কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করা হয়নি। স্থানীয় পুরনো নথিতে এমনও উল্লেখ আছে যে বাড়ির পুরনো বেসমেন্ট একসময় হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, এবং তার পর থেকেই পরিবারের আচরণ বদলে যায়।
কেউ জানে না সত্যি কী ঘটেছিল। কিন্তু যারা কাছ থেকে সেই বাড়িটি দেখেছে, তারা এক বিষয় নিয়ে একমত— বাড়ির করিডোরে দাঁড়ালে অকারণ এক চাপা অনুভূতি হয়, যেন কেউ খুব কাছ থেকে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।
ড্যানিয়েল ক্রস আর কখনও সেই বাড়িতে ফিরে যায়নি। তার তোলা সেই ছবিটি আজও বিভিন্ন প্যারানরমাল ফোরামে ঘুরে বেড়ায়। কেউ বলে এটা নিছক কাকতালীয়, কেউ বলে অপটিক্যাল ইলিউশন। কিন্তু যারা ছবিটিকে অনেকক্ষণ ধরে দেখেছে, তাদের অনেকেই এক অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছে— প্রথমবার দেখার সময় যতগুলো মুখ দেখা যায়, কয়েক মিনিট পরে ছবিটিতে যেন আরও কয়েকটি অস্পষ্ট মুখ দেখা যেতে শুরু করে।
ব্ল্যাকউড হিলের পুরনো বাসিন্দাদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে— “গ্রে হাউস কখনও পুরোপুরি খালি থাকে না। কেউ না কেউ সবসময় করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকে।”
এলাকার কয়েকজন বৃদ্ধ বলেন, তাদের ছোটবেলায় দাদু-নানুরা একটি সতর্কবাণী দিতেন— সন্ধ্যার পর যদি কখনও পাহাড়ের ওই রাস্তা দিয়ে যেতে হয়, তাহলে বাড়িটির দিকে তাকিয়ে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থেকো না। কারণ, কেউ যদি বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকে, মাঝে মাঝে মনে হয় ভেতরের অন্ধকার থেকে কেউ তাকিয়ে হাসছে।
আজও বাড়িটি পরিত্যক্ত, তালাবদ্ধ। কিন্তু মাঝে মাঝে ভ্রমণপ্রেমী কিছু মানুষ দূর থেকে ছবি তুলতে যায়। আর আশ্চর্যের বিষয়— প্রায় প্রতি বছরই কেউ না কেউ দাবি করে যে তার তোলা ছবিতে করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাকের একটি ছোট মেয়ের অস্পষ্ট অবয়ব ধরা পড়েছে।
এটা কি শুধু আলো-ছায়ার খেলা? নাকি সত্যিই শত বছর আগের কোনো অসমাপ্ত গল্প এখনও সেই বাড়ির ভেতরে আটকে আছে— যার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে করিডোরের সেই মুখহীন পুতুলটি?

0 Comments