লেখক: নুর
চট্টগ্রামের পুরনো রেল স্টেশনে, সেদিন নানুবাড়ি থেকে ফিরছিলাম। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিলাম, ঠিক তখনই আমার পাশে এলেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, জীবনের অনেকটা পথ তিনি পেরিয়ে এসেছেন। জানতে পারলাম, তার নাম শিপন, এবং তিনি কুলির কাজ করেন।
ট্রেন ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল, আর আমরা দুজনে টুকটাক কথা বলছিলাম। এক পর্যায়ে আমি তাকে জানালাম যে আমি লেখালেখি করি। এটা শুনে তিনি একটু যেন থমকে গেলেন। এরপর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তাহলে শুনুন আমার জীবনের একটা সত্য ঘটনা। এমন এক অভিজ্ঞতা, যা আমাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।"
তার কথায় এক ধরনের অনুতাপ আর বিষণ্ণতা ছিল, যা আমাকে আগ্রহী করে তুলল।
শিপন ভাই বলতে শুরু করলেন, "আজ থেকে প্রায় সাত-আট বছর আগের কথা। তখন আমি পুরোপুরি নেশাগ্রস্ত ছিলাম। প্রতিদিন রাতে বন্ধুদের নিয়ে রেললাইনের ধারে বসে মদ, গাঁজা, হেরোইন খেতাম।"
তিনি জানালেন, তাদের আড্ডার জায়গাটা ছিল দুটি রেললাইনের মাঝখানে, ঝোপঝাড় আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে। এলাকার মানুষ বলত জায়গাটা অভিশপ্ত, কারণ এখানে অনেক মানুষ ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে। কিন্তু তারা এসব কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিতেন। নির্জন এই জায়গাটাই তাদের কাছে নেশার স্বর্গের মতো ছিল।
একদিন রাতে তারা চার বন্ধু নেশায় বুঁদ হয়ে শুয়ে গল্প করছিলেন। হঠাৎ শিপন ভাইয়ের কানে ভেসে এল একটি শিশুর কান্নার শব্দ। তিনি চমকে উঠে দেখলেন, প্রায় ৩০ হাত দূরে রেললাইনের ওপর একটি শিশু শুয়ে কাঁদছে। এত নির্জন জায়গায় একটি শিশু! তিনি ভয়ে বন্ধুদের ডাকলেন, কিন্তু কেউ জাগল না। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ৩টা ৪০ মিনিট। সেই কান্না প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলে হঠাৎ থেমে গেল। বন্ধুরা তার কথা বিশ্বাস করল না, বলল— "নেশার ঘোরে বিড়ালের ডাক শুনেছিস হয়তো।"
তারা সেদিন ফিরে এলেন, কিন্তু শিপন ভাই জানতেন, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না।
পরের দিন রাতেও তারা সেখানেই আড্ডা দিতে গেলেন। রাত প্রায় ৩টার দিকে তার বন্ধুদের শরীর খারাপ লাগা শুরু হলো। তারা সবাই ফিরে যেতে চাইল, কিন্তু শিপন ভাই তখন এতটাই নেশাগ্রস্ত ছিলেন যে, নড়াচড়ার শক্তিও ছিল না। তিনি বন্ধুদের বললেন— "তোরা যা, আমি একটু ঘুমিয়ে নিই।" বন্ধুরা তাকে একা ফেলে চলে গেল।
তারা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার ঘুম ভেঙে গেল। এবার তার কানে এল এক মেয়ের কান্নার শব্দ! তিনি দেখলেন, আগের দিনের শিশুর জায়গায় এবার এক মেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছে। তিনি পাথর ছুঁড়ে মারলেন, আর তাতেই মেয়েটি কান্না থামিয়ে মাথা তুলল। চাঁদের আবছা আলোয় তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার চোখগুলো জ্বলজ্বল করছিল। এরপর সে ধীরে ধীরে ঝোপের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
শিপন ভাই উঠে দাঁড়াতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। মনে হলো তার ঘাড়ের উপর অসহ্য একটা চাপ, যেন কেউ তার কাঁধের উপর বসে আছে! সেই অজানা সত্তা তার চুল ধরে টানছিল আর নখ দিয়ে তার মুখ আঁচড়ে দিচ্ছিল। তিনি চিৎকার করতে করতে জ্ঞান হারালেন।
পরের দিন সকালে তার জ্ঞান ফিরল হাসপাতালের বিছানায়। তার মা-বাবা পাশে বসে ছিলেন। তারা জানালেন, ফজরের নামাজের আগে কিছু মানুষ তাকে রেললাইনের ওপর পড়ে থাকতে দেখে। তারা প্রথমে ভেবেছিল তিনি ট্রেনে কাটা পড়েছেন। কিন্তু জীবিত দেখতে পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার জানান, আর একটু দেরি হলে তিনি হয়তো বাঁচতেন না। কারণ তার জ্ঞান হারানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই লাইন দিয়ে ভোরের ট্রেন চলে যায়।
শিপন ভাইয়ের কণ্ঠে এক ধরনের কৃতজ্ঞতা ছিল। তিনি বললেন, "ভাগ্যিস আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। সেদিন ওই ঘটনা না ঘটলে হয়তো আমি কখনোই নেশার জগৎ থেকে বের হতে পারতাম না।"
ট্রেন ছাড়ার হুইসেল বেজে উঠল। শিপন ভাই আমাকে বিদায় জানালেন। তার জীবনের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল, কিছু ঘটনা জীবনকে বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
গল্পের এই অংশটুকু লেখার পর, আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম। শিপন ভাইয়ের বলা প্রতিটি শব্দ যেন কানে বাজছিল। মনে হচ্ছিল, সেই রাতের হিমশীতল বাতাস, সেই অন্ধকারের ভয়াবহতা আর অভিশপ্ত রেললাইনের রহস্যময়তা আমি নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। একটি সাধারণ আড্ডা, যা একজন মানুষকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছিল, এবং একই সাথে তাকে নতুন জীবনের পথে চালিত করেছিল।
হঠাৎই আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগল। যে মানুষগুলো শিপন ভাইকে বাঁচিয়েছিল, তারা কারা? শিপন ভাই কি তাদের সাথে আর কখনও দেখা করেছিলেন? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আমি পরের স্টেশনে নেমে পড়লাম। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। এমন ঘটনাগুলো জীবনের অনেক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
শিপন ভাইয়ের গল্প আমাকে ভাবাল। জীবন কতটা অনিশ্চিত, আর নিয়তি কতটা রহস্যময়, তা উপলব্ধি করলাম। রেললাইনের সেই অভিশপ্ত জায়গাটি হয়তো এখনও অনেকের জন্য বিভীষিকার কারণ, কিন্তু শিপন ভাইয়ের কাছে তা একটি দ্বিতীয় জীবনের সূচনা। তিনি হয়তো আজও কুলির কাজ করে চলেছেন, আর প্রতিটা নতুন ভোরের ট্রেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই রাতের কথা, যখন তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা দিয়ে ফিরে এসেছিলেন...see moer
আমি নিশ্চিত, শিপন ভাইয়ের গল্প শুধু একটি ভৌতিক কাহিনি নয়, বরং এটি আত্মোপলব্ধি এবং পুণর্জন্মের এক অসাধারণ উপাখ্যান।

0 Comments