জীবন্ত আত্মা

লেখক : নুর


আমি রাজ, আর আমার বন্ধুদের সাথে হোস্টেলে গরমের ছুটি কাটিয়ে সবে ফিরেছি। ক্লাসের চাপ এখনো তেমন নেই, তাই আমাদের আড্ডা রোজ রাতে জমে ওঠে। কত যে গল্প হয়, তার শেষ নেই। এই যেমন ধর, আমার বন্ধু শাহেদ তার দূরসম্পর্কের এক চাচার কাছ থেকে কী এক ভূতুড়ে গল্প শুনে এসেছে। তার চাচা নাকি চক্রে বসে মৃত আত্মাদের ডেকে এনেছিলেন! শাহেদ সেই গল্পটা এতবার আমাদের শুনিয়েছে যে আমরা প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছি। কাল রাতে যখন আড্ডা প্রায় শেষ, হঠাৎ শাহেদ বলে উঠল, "আয়, আজ আমরাও চক্রে বসি।"


মুহূর্তে সবাই হই হই করে উঠল, "চল, চল বসি।"


আমার আরেক বন্ধু রাশেদ একটু আপত্তি করে বলল, "কিন্তু আমরা তো জানি না কীভাবে বসতে হয়!"


শাহেদ বলল, "কে বলেছে জানি না? আমি তো তোদের সব শিখিয়ে দিয়েছি।"


কথাটা সত্যি, শাহেদ কীভাবে চক্রে বসতে হয় তার নিয়মকানুন বারবার শুনিয়েছিল। আমাদের মধ্যে কয়েকজন একটু ভয় পেয়েছিল, যেমন আমি। আমি বললাম, "আমার ভয় করে।"


কিন্তু বাকিদের প্রবল উৎসাহের কাছে আমাদের ভয় পাত্তা পেল না। তাই আমরা আমাদের রুমের খাটগুলো পেছনে ঠেলে, টেবিলটা কোনায় সরিয়ে মেঝেতে একটা বড় চাদর বিছিয়ে গোল হয়ে বসে পড়লাম। ঘরের আলো নিভিয়ে একটা ছোট পিরিচে মোমবাতি জ্বালানো হলো। মোমবাতির হালকা আলোয় ঘরের ভেতরে একটা ছমছমে ভাব তৈরি হয়ে গেল।


শাহেদ বলল, "সবাই সামনে হাত রাখ। একজনের বাম হাতের ওপর আরেকজনের ডান হাত।"


আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এখন কী করব?"


শাহেদ বলল, "চোখ বন্ধ করে মৃত মানুষের কথা ভাবতে থাক।"


"কোন মৃত মানুষের কথা ভাবব?"


শাহেদ ধমক দিয়ে বলল, "তোর যাকে ইচ্ছা।"


আমি বললাম, "আমি মরা মানুষের কথা ভাবতে পারব না। আমার ভয় লাগে।"


শাহেদ বলল, "ভয় করলে চুপ করে বসে থাক। অন্যদের ডিস্টার্ব করবি না।"


মোমবাতি নিভিয়ে দেওয়া হলো। ঘরটা আবছা অন্ধকারে ডুবে গেল। আমি হাত ছেড়ে দিয়ে বললাম, "না না ভাই, আমি বসব না। আমার ভয় করে।"


শাহেদ রেগে বলল, "এতগুলো ছেলে বসে আছে, তোর ভয় কিসের?"


আমি কোনো যুক্তি দেখালাম না। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, "আমি চললাম। এসব ভালো লাগে না।"

আমি সত্যি সত্যি দরজা খুলে বেরিয়ে গেলাম। শাহেদ পেছন থেকে বলল, "দাঁড়া! প্রেতাত্মারা আসুক, আমরা যদি তাদের তোর ঘরে পাঠিয়ে দিই!"


আমি চলে যাওয়ার পর ওরা আমাকে নিয়ে কিছুক্ষণ গজগজ করল। তারপর আবার চক্রে বসে পড়ল। একজনের হাতের ওপর আরেকজনের হাত রেখে তারা চোখ বন্ধ করে মৃত মানুষের কথা ভাবতে লাগল। ঘর অন্ধকার, সবাই চুপচাপ বসে আছে। দেখতে দেখতে একটা ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু তাদের চক্রে বসার ব্যাপারটা শাহেদের গল্পের মতো গম্ভীর বা চমকপ্রদ হলো না।


আমাদের এক বন্ধু, শাওন, তার একটু হাসির রোগ আছে। সে কিছুক্ষণ পর থেকেই হাসতে শুরু করে দিল। হাসিটা গোপন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার শরীর কাঁপছিল আর মুখ থেকে বিদঘুটে আওয়াজ বের হচ্ছিল।




অর্ধেক রাতে ওরা আবিষ্কার করল যে হাসি খুব সংক্রামক। শাওনকে দেখে আরও কয়েকজন হাসতে শুরু করল। শেষে শাহেদ আর দুই-এক জন ছাড়া বাকি সবাই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল।

মৃত আত্মারা হয়তো এমন হাসিখুশি পরিবেশ পছন্দ করে না। এক ঘণ্টা পর ওরা দেখল যে রাত অনেক গভীর হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের কেউ কোনো আত্মাকে আনতে পারেনি।


শাহেদ বিরক্ত হয়ে বলল, "অনেক হয়েছে। এবার শেষ কর।"


আমার আরেক বন্ধু, হাসান, বলল, "তোদের দিয়ে কিছু হবে না। চক্রে বসেও শুধু ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হাসিস।"


শাহেদ বলল, "এটা হাসির ব্যাপার না। এটা খুব সিরিয়াস ব্যাপার।"


শাওন হাসি চেপে বলল, "হাসি উঠে গেলে কী করব?"


শাহেদ রেগে বলল, "হাসি উঠে গেলে এসব জায়গায় আসবি না।"


শাহেদ বলল, "আমার চাচা বলেছেন চক্রে মৃত আত্মাকে ডেকে ঠাট্টা-তামাশা করলে আত্মার কষ্ট হয়।"


শাওন বলল, "তাহলে মৃত আত্মা না এনে জীবন্ত আত্মা আনলেই হয়।"


হাসান জিজ্ঞেস করল, "জীবন্ত আত্মাটা কী জিনিস?"


শাওন বলল, "যে মানুষ মারা যায়নি, তার আত্মা।" জীবন্ত মানুষের আত্মা আনার এই ধারণাটা শাওনের কাছে খুব মজার মনে হলো। সে হি হি করে হাসতে শুরু করল।


আকাশ নামের একজন বলল, "শাওন তো ঠিকই বলেছে। চক্রে বসে যদি জীবন্ত মানুষের আত্মা ডাকি, তাহলে কী হবে?"


শাহেদ বিরক্ত হয়ে বলল, "ফাজলামি করিস না। চক্রে বসে মৃত আত্মাদের ডাকা হয়।"


"আমরা ডাকব জীবন্ত মানুষের আত্মাদের।"


শাওন হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, "আয় আমরা একটা পরীক্ষা করি। চক্রে বসে আমরা রাজকে ডাকি! দেখি এই ভীতুর ডিমটার ঘুম ভেঙে যায় কি না।"


শাহেদ বলল, "শোন। চক্র একটা সিরিয়াস ব্যাপার। এটা নিয়ে ফাজলামি করবি না।"

শাওন বলল, "আমরা কোথায় ফাজলামি করছি? আমরা তো একটা এক্সপেরিমেন্ট করছি। মৃত মানুষের আত্মাকে না ডেকে জীবন্ত মানুষের আত্মাকে ডাকছি। পরে রাজকে জিজ্ঞেস করব সে কিছু টের পেয়েছে কি না।"


কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চলার পর সবাই আবার চক্রে বসতে রাজি হলো, তবে এবার মৃত মানুষের বদলে জীবন্ত মানুষকে ডাকা হবে। কাকে ডাকা হবে, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক হলো না। সবাই একমত হলো যে আমাকেই ডাকা হবে।


ঘরের বাতি নিভিয়ে তারা আবার গোল হয়ে বসে পড়ল। একজনের হাতের ওপর আরেকজন হাত রেখে চোখ বন্ধ করে তারা আমার কথা ভাবতে লাগল। শাওন পর্যন্ত এবার হাসা বন্ধ করল। শাহেদ ফিসফিস করে বলল, "রাজ! আমরা তোমাকে চক্রে আহ্বান করছি। তুমি এসো! তুমি এসো আমাদের মাঝে।"


দশ মিনিট এভাবে কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত ছেলে, আমার বন্ধু শামীম, হঠাৎ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তার শরীরটা কাঁপতে শুরু করল। পাশে বসে থাকা আকাশ ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, "শামীম! কী হয়েছে তোর?"


শামীম কোনো কথা বলল না, শুধু তার নিঃশ্বাস আরও দ্রুত হলো, শরীর আরও জোরে কাঁপতে লাগল। মুখ দিয়ে গোঙানোর মতো এক ধরনের শব্দ বের হচ্ছিল।


শাহেদ জিজ্ঞেস করল, "শামীম। কী হয়েছে তোর?" শামীম কোনো উত্তর দিল না।


শাহেদ আবার ডাকল, "শামীম! এই শামীম।"

শামীম এবার উত্তর দিল, চাপা গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমি শামীম না।"


"তাহলে তুই কে?"


"আমি রাজ।"


সবাই চমকে উঠল। শাহেদ বলল, "তুই এখানে কী করছিস?"


"তোরা আমাকে ডেকেছিস, তাই আমি এসেছি। তোরা বল কেন আমাকে ডেকেছিস?"


তারা নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। শুধু যে কণ্ঠস্বর হুবহু আমার মতো তা নয়, কথা বলার ভঙ্গি আর আমার আঞ্চলিক টানটুকু পর্যন্ত ছিল। শাহেদ বলল, "তুই সত্যিই রাজ?"


"হ্যাঁ।"


"তোর কেমন লাগছে?"


"ভালো লাগছে না।"


"কেন ভালো লাগছে না?"


আমার গলার স্বরটা হঠাৎ কেমন যেন হাহাকারের মতো শোনাল। ভাঙা গলায় বলল, "তোরা কেন আমাকে ডাকলি? কেন?"


আমার কণ্ঠস্বরে শামীম হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল। শাহেদ ভয় পেয়ে বলল, "চক্র ভেঙে দাও সবাই। হাত ছেড়ে দাও।"


সবাই তাড়াতাড়ি হাত ছেড়ে দিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শামীম কান্না থামিয়ে মাথা তুলে তাকাল। শাহেদ গিয়ে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিল। হঠাৎ করে আলো জ্বালায় সবার চোখ সয়ে যেতে একটু সময় লাগল। সবাই শামীমের মুখের দিকে তাকাল। শাহেদ জিজ্ঞেস করল, "শামীম, তোর কী হয়েছিল?"


শামীমকে খুব বিচলিত দেখাচ্ছিল। শুকনো মুখে বলল, "আমি জানি না। আমার স্পষ্ট মনে হলো..."

"কী মনে হলো?"


শামীম প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, "আয় আগে দেখি রাজ কী করছে।"


"ঠিকই বলেছিস," বলে শাহেদ দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এল। করিডরের শেষ মাথায় আমার সিঙ্গেল সিটেড রুম। তারা দ্রুত পায়ে আমার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শাহেদ দরজায় শব্দ করে ডাকল, "রাজ।"


ভেতর থেকে কোনো শব্দ হলো না। তখন শাহেদ আরও জোরে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, "এই রাজ। রাজ..."


আমি তবুও জেগে উঠলাম না। তখন বাকিরাও দরজা ধাক্কা দিতে শুরু করল, ভয় পাওয়া গলায় ডাকতে লাগল, "রাজ! দরজা খোল রাজ!"


তাদের হইচই শুনে পাশের রুম থেকে অন্যরাও জেগে উঠল আর ভিড় করল। তবুও আমি ঘুম থেকে জাগলাম না। ভয় পেয়ে এবার কয়েকজন মিলে একসাথে দরজায় ধাক্কা দিল। কয়েকবার জোরে ধাক্কা দিতেই দরজার ছিটকিনি ভেঙে হঠাৎ করে দরজাটা খুলে গেল। ছেলেরা হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল। একজন লাইট সুইচটা টিপে আলো জ্বালিয়ে দিল। মশারির ভেতর একটা অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমি উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলাম। শাহেদ ছুটে গিয়ে আমাকে উল্টে দিল। আমার চোখ দুটো আধখোলা আর সেখানে শূন্য দৃষ্টি। মুখটা একটু ফাঁক হয়ে জিহ্বাটা বেরিয়ে ছিল।


শাহেদ একটা চিৎকার করে পেছনে সরে এল, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল। বিছানায় শুয়ে আমার মৃতদেহ শূন্যদৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। চক্রে বসে তারা সত্যি সত্যিই আমার আত্মাটিকে বের করে এনেছিল।


শাহেদের চিৎকারে পুরো হোস্টেল জেগে উঠল। অন্য রুমের ছেলেরা ছুটে এল। শামীম, শাওন, হাসান, আকাশ — সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের চোখের সামনে এক ভয়ংকর দৃশ্য। আমার নিথর দেহটা বিছানায় পড়ে আছে, চোখ দুটো শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন এই দেহটা আর আমার না, শুধু একটা খোলা খোলস। অন্য ছেলেরা হতভম্ব হয়ে পুলিশে খবর দিল। খুব দ্রুতই পুলিশ এল। তাদের কাছে গল্পটা ছিল শুধুই একটা ভৌতিক গল্প, যা তারা বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিন্তু আমার বন্ধুরা বারবার বলছিল, "আমরা রাজের আত্মাকে ডেকেছিলাম!"...see moer