ঘটনাটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু আসল ভয়টা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল কয়েক দিন পর। কলকাতায় ফিরে আসার পর আমি মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত ছিলাম যে কয়েক দিন বাড়ি থেকেই বেরোইনি। সেই রাতের ঘটনা, ওই আর্তনাদ, রক্তের স্রোত, সবকিছু দুঃস্বপ্নের মতো আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল।
একদিন রাতে ঘুম ভেঙে গেল একটা ফোন কলে। অচেনা নম্বর। ফোনটা ধরতেই ওপার থেকে একটা শান্ত, শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কণ্ঠটা অয়নের।
ও খুব শান্তভাবে বলল, "কিরে, কেমন আছিস?"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "এত রাতে ফোন করেছিস? সব ঠিক আছে তো?"
অয়ন একটা অদ্ভুত হাসি হেসে বলল, "সব ঠিক আছে। শুধু তোকে একটা কথা জানানোর জন্য ফোন করলাম। তুই কি জানতে চাস, সেদিন রাতে ওই ৩০১ নম্বর ঘরে ঠিক কী হয়েছিল?"
ওর গলার স্বরটা আমার কেমন যেন অচেনা লাগছিল। শান্ত, কিন্তু তার গভীরে কিছু একটা লুকিয়ে আছে। আমি দ্বিধাগ্রস্তভাবে বললাম, "কী হয়েছিল?"
অয়ন বলতে লাগল, "ওই লোকটা, মানে স্বামীটা, তার বউকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু বউটার অন্য একজনের সাথে সম্পর্ক ছিল। লোকটা সেটা জানতে পেরে যায়। সেদিন রাতে ওদের মধ্যে ঝগড়া হয়। লোকটা রাগের মাথায় বউকে গলা টিপে খুন করে ফেলে। তারপর যখন তার হুঁশ ফেরে, সে বুঝতে পারে সে কী ভয়ঙ্কর কাজ করে ফেলেছে। অনুশোচনায়, ভয়ে সে নিজেও হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।"
আমি চুপ করে শুনছিলাম। এগুলো তো ম্যানেজারের কাছেই শুনেছি।
অয়ন বলে চলল, "কিন্তু আসল গল্পটা অন্য জায়গায়। লোকটা মরেনি। সে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু তার মানসিক স্থিতি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার স্ত্রী মরেনি, সে শুধু ঘরের ভেতরে লুকিয়ে আছে। সে তাকে এতটাই ভালোবাসত যে তার মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেনি। তাই সে সবাইকে বলে বেড়াত যে তার স্ত্রী বেঁচে আছে, শুধু ঘর থেকে বেরোতে চাইছে না।"
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আমি কাঁপা গলায় বললাম, "তুই এসব কী বলছিস, অয়ন?"
অয়ন হাসল। একটা শীতল, অর্থহীন হাসি। "আমি ঠিকই বলছি। কারণ সেই লোকটা আমি। আর আমার স্ত্রী, যাকে আমি এত ভালোবাসি, সে এখনো ওই ৩০১ নম্বর ঘরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাকে একা ফেলে চলে এসেছিলাম। এটা আমার ঠিক হয়নি। তাই আমি আবার ফিরে যাচ্ছি ওর কাছে। শিলিগুড়িতে। তুইও আয়। আমরা তিনজন আবার একসা
থে থাকব। ও তোকেও খুব পছন্দ করবে।"
আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। আমি দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে পড়লাম। আমার সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। অয়নের শেষ কথাগুলো আমার কানে বাজছিল—"তুইও আয়... আমরা তিনজন একসাথে থাকব..."
আমি বুঝতে পারছিলাম, সেই রাতের ঘটনা শুধু অয়নকে শারীরিকভাবে প্রভাবিত করেনি, মানসিকভাবেও গ্রাস করেছে। ওই হোটেলের অভিশাপ, ওই অতৃপ্ত আত্মার যন্ত্রণা হয়তো ওর দুর্বল মনের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে। অথবা, হয়তো কোনো ডার্ক সাইকোলজির বশবর্তী হয়ে অয়ন নিজেই নতুন এক গল্প তৈরি করেছে, যেখানে সে নিজেই সেই গল্পের নায়ক, সেই অপ্রকৃতিস্থ প্রেমিক। সে কি সত্যিই শিলিগুড়ি ফিরে যাচ্ছে? নাকি এটাও তার অসুস্থ মস্তিষ্কের কল্পনা?
আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমার বন্ধু অয়নকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। সে এখন আর আমার চেনা অয়ন নেই। সে এখন 'হোটেল ব্লু মুন'-এর ওই বন্ধ ঘরেরই একটা অংশ হয়ে গেছে। আর আমি? আমি সেই ভয়ঙ্কর রাতের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছি, প্রতি মুহূর্তে এই ভয়ে যে, কখন আবার একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসবে আর ওপার থেকে একটা শীতল কণ্ঠস্বর বলে উঠবে, "কিরে, আসবি না? ও তোর জন্য অপেক্ষা করছে..."
0 Comments