মাইক্রোবাসের চাকাগুলো পিচঢালা রাস্তা ধরে চেনা গতিতে ছুটে চলেছে। গাড়ির ভেতরে তখন উৎসবমুখর পরিবেশ। শিহাবের পরিবারের সবাই মিলে মেতে উঠেছে নানারকম গল্প আর হাসাহাসিতে। কেউ হয়তো জানালার বাইরের দৃশ্য দেখছে, কেউ আবার পুরোনো কোনো পারিবারিক স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও শিহাব যেন একটু অন্যমনস্ক। তার চোখ দুটো বারবার গাড়ির জানালার বাইরে চলে যাচ্ছিল।

গাড়িটা যখন মোড় ঘুরে বিখ্যাত চাঁদনী কলেজের ঠিক সামনে এসে পৌঁছাল, তখন আচমকাই শিহাবের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। হাজারো চেনা-অচেনা মুখের ভিড়ের মাঝেও কিছু রূপ যেন চোখ এড়ায় না। কলেজের মূল ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক তেমনই এক চেনা অবয়বের ওপর গিয়ে থমকে গেল শিহাবের দৃষ্টি।

সে আর কেউ নয়, চাঁদনী। রোদের আলোয় তাকে বরাবরের মতোই ভীষণ স্নিগ্ধ আর মায়াবী দেখাচ্ছিল। তাকে দেখামাত্রই শিহাবের চারপাশের সমস্ত কোলাহল যেন এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। পরিবারের আড্ডা, গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ—সবকিছু ছাপিয়ে তখন শিহাবের হৃদয়ে কেবল একজনেরই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

"ড্রাইভার ভাই! ড্রাইভার ভাই, গাড়িটা একটু বামে চাপিয়ে জলদি থামান তো!" শিহাবের গলায় এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর তাড়াহুড়ো।

ড্রাইভার ব্রেক কষতেই গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে থামল। পরিবারের সবাই একটু অবাক হয়ে শিহাবের দিকে তাকাল। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার মতো মানসিক অবস্থা তখন শিহাবের নেই। সে দ্রুত জানালার কাচটা পুরোটা নামিয়ে একটু ঝুঁকে, মনের সবটুকু আকুলতা ঢেলে ডাক দিল, "চাঁদনী!"

সেই চেনা, অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে আসতেই চাঁদনী চমকে তাকাল। চারিদিকে চোখ বোলাতেই গাড়ির জানালায় শিহাবের মুখটা তার নজরে এলো। শিহাবকে সেখানে, তাও আবার সপরিবারে দেখে চাঁদনীর চোখে-মুখে এক চিলতে অবাক করা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে হাতের ইশারায় কলেজের ভেতরের বিল্ডিংটা দেখিয়ে বলল, "আমি ক্লাস রুমে বইগুলো রেখে এখনই আসছি। তুমি একটু দাঁড়াও।"

চাঁদনী ভেতরে চলে যেতেই শিহাবের তর সইছিল না। মাত্র কয়েক মিনিটের এই দূরত্বটাও তার কাছে তখন দীর্ঘ প্রতীক্ষার মতো মনে হতে লাগল। সে আর গাড়িতে বসে থাকতে পারল না। লক খুলে চট করে গাড়ি থেকে নেমে পিচঢালা রাস্তায় এসে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কলেজপড়ুয়া ছেলে বেশ কৌতূহল আর উৎসুক গলায় ডেকে উঠল, "শিহাব ভাই!"

শিহাব কিছুটা অবাক হয়ে ঘুরে তাকাল। ছেলেটিকে সে ঠিক চিনতে পারল না। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "হ্যাঁ ভাই, বলো। কী হয়েছে?"

ছেলেটি মুখে একটা চতুর ও মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলল, "চাঁদনী আপু আপনাকে ভেতরে ডাকছে। ওই যে ওপরের ক্লাস রুমটায়। আমার সাথে আসুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।"

এক মুহূর্তও নষ্ট না করে শিহাব ছেলেটার পিছু পিছু কলেজের করিডোর ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। চারপাশের ক্লাসরুম থেকে ভেসে আসা চেনা গুঞ্জন, করিডোরে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা—কোনো কিছুই শিহাবের মনোযোগ কাড়তে পারছিল না। তার পুরো সত্ত্বা তখন কেবল ওই ওপরের ক্লাস রুমটার দিকেই ছুটে চলছিল।

করিডোর পার হয়ে ছেলেটি একটি নিরিবিলি ক্লাস রুমের সামনে এসে দাঁড়াল এবং ইশারায় শিহাবকে ভেতরে যেতে বলে নিজেই একসময় ভিড়ে হারিয়ে গেল। শিহাব দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো চাঁদনী।

সেখানের পরিবেশটা তখন একদম শান্ত, নিস্তব্ধ। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা দুপুরের নরম আলো এসে পড়েছে চাঁদনীর মুখের ওপর। চাঁদনী কোনো কথা বলল না। তার ডাগর চোখ দুটিতে তখন হাজারো না বলা কথা, জমানো একরাশ অভিমান আর গভীর ভালোবাসা খেলা করছে। সে আলতো করে, পরম আকুলতায় নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল শিহাবের দিকে। যেন এই একটা হাতের ছোঁয়াতেই সে পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব মুছে দিতে চায়।

শিহাব এক সেকেন্ডের জন্যও দ্বিধা করল না। নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরম ভরসা আর ভালোবাসায় চাঁদনীর সেই নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। ঠিক তখনই, এক জাদুকরী আর অমোঘ টানে চাঁদনীকে নিজের চওড়া বুকের একদম গভীরে টেনে নিল শিহাব।

হুট করেই যেন পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম ভেঙে গেল। চাঁদনী তার এতদিনের জমানো সমস্ত আকুলতা আর ক্লান্তি ভুলে শিহাবের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। দুই হাত দিয়ে সে শিহাবকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন এই বুকে একবার আশ্রয় পাওয়ার পর আর কখনোই সে দূরে যেতে চায় না।

শিহাবও তার এক হাত চাঁদনীর পিঠে আর অন্য হাত তার চুলে বিলি কেটে পরম আবেশে তাকে জড়িয়ে ধরে রাখল। বাইরের চড়া রোদ, পরিবারের অপেক্ষা কিংবা কলেজের হাজারো মানুষের কোলাহল—সবকিছু তখন ওই একটি আলিঙ্গনের কাছে হেরে গেছে। দুটি হৃদয়ের চেনা স্পন্দন তখন এক হয়ে মিশে গেছে এক চিরন্তন ও গভীর ভালোবাসার কাব্যে।